Dhaka ০৫:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনাম
বুয়েটের ডিগ্রি, ছেড়েছেন লোভনীয় চাকরি—প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষক নায়লা শারাফ ২৬ অক্টোবর জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্গাপূজার ছুটি বাড়ল এক দিন, ২০–২৪ অক্টোবর টানা ছুটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে ২০২৬ সালের নোবেল পেলেন ডেইসেরথ, হেগেম্যান ও নাগেল বিসিআইসির চেয়ারম্যান হলেন অতিরিক্ত সচিব মো. বাবুল মিঞা শিক্ষকতা ‘উপায়হীন বিকল্প’ নয়, মেধাবীদের প্রথম পছন্দ করতে হবে: তারেক রহমান ধানমন্ডিতে যাত্রা শুরু করল আকিজ ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডারে ২৫২ টাকা বাড়ল, নতুন দাম ১,৮৩৭ টাকা ডিআইজি-অতিরিক্ত ডিআইজিসহ পুলিশের ২৪ কর্মকর্তাকে বদলি যানজট নিরসনে ইনার সার্কুলার রিং রোডের কাজ দ্রুত শেষের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

বিশ্ব পর্যটন দিবস: সমুদ্র-পাহাড়-ঝরনা-ঐতিহ্যে অনন্য চট্টগ্রাম, পর্যটনে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি

এক পাশে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি, অন্য পাশে পাহাড়ের সবুজ দেয়াল। কোথাও পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসছে স্বচ্ছ ঝরনার পানি, কোথাও পাহাড়ের পাদদেশে শান্ত লেক, আবার কোথাও বিস্তীর্ণ বালিয়াড়িতে ছন্দ তুলছে ঢেউ। কোথাও রয়েছে শতবর্ষী স্থাপনা, ধর্মীয় ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি কিংবা চা-বাগানের সবুজ গালিচা। শহরের ব্যস্ততা পেরোলেই প্রকৃতি যেন বদলে দেয় তার রং।

একই ভূখণ্ডে প্রকৃতির এমন নানারূপ যেন বিশাল এক প্রদর্শনী। এই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য চট্টগ্রামকে দিয়েছে বিপুল পর্যটন সম্ভাবনা। পুরো চট্টগ্রামের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে খুলতে পারে নতুন সমৃদ্ধির দুয়ার, যা দেশের অর্থনীতিকে নিয়ে যেতে পারে নতুন উচ্চতায়।

আজ ২৭ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব পর্যটন দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য—‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে নানা আনুষ্ঠানিকতায় দিবসটি উদযাপিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা হলো পর্যটন খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল রূপান্তরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো।

দিবসটি উপলক্ষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে আজ থেকে সপ্তাহব্যাপী নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনও দিবসটি উদযাপনে আজ র‌্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বন্দরনগরী হিসেবে চট্টগ্রামের পরিচিতি দেশের অর্থনীতিতে বহু পুরোনো। অর্থনীতির পাশাপাশি পর্যটনেও এ জেলার সম্ভাবনা বিস্তৃত। সমুদ্র, পাহাড়, ঝরনা, বন, লেক, দ্বীপ, চা-বাগান, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও ধর্মীয় ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে এখানে পর্যটনের যে বৈচিত্র্য রয়েছে, তা দেশের অন্য অনেক গন্তব্যের তুলনায় আলাদা মাত্রা তৈরি করেছে।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, ফয়’স লেক, ভাটিয়ারী লেক, বাটালি হিল, বাঁশখালী ইকোপার্ক, মহামায়া লেক, খৈয়াছড়া ঝরনা, বাঁশবাড়িয়া, গুলিয়াখালী ও পারকি সৈকত ইতিমধ্যে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এসব গন্তব্যকে ডিজিটাল রূপান্তরের আওতায় এনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভ্রমণপিপাসুদের মতে, পর্যটনের সৌন্দর্য চট্টগ্রামকে করেছে অনন্য। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে একদিকে সমুদ্রের বিস্তৃত জলরাশি, অন্যদিকে দেখা যায় বন্দরনগরীর কর্মচাঞ্চল্য। সূর্যাস্তের সময় আকাশের রং বদলে যায়, সমুদ্রের ঢেউয়ে পড়ে তার প্রতিফলন। কাছেই কর্ণফুলীর মোহনা। জাহাজের চলাচল, নদী ও সাগরের মিলন এবং উন্মুক্ত আকাশ—সব মিলিয়ে পতেঙ্গা শুধু একটি সৈকত নয়, নগরীর সঙ্গে প্রকৃতির সরাসরি সংযোগও।

পতেঙ্গার বাইরেও চট্টগ্রামের উপকূলজুড়ে রয়েছে আরও অনেক সম্ভাবনাময় সৈকত। আনোয়ারার পারকি, সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ও গুলিয়াখালী, বাঁশখালী সৈকত এবং খেজুরতলার রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। পর্যটকেরা যেদিকেই পা বাড়ান, বদলে যায় দৃশ্যপট, দেখা মেলে নতুন কিছুর। পাহাড়, বন, ঝরনা ও সমুদ্র যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা হাজারো ঝরনা অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের জন্য একেকটি আলাদা অধ্যায়।

‘চলো চট্টগ্রাম দেখি’ নামের ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সাজ্জাতুল ইসলাম তুহিন বাসসকে বলেন, ‘প্রকৃতি চট্টগ্রামকে আপন হাতে সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে, এখানকার সৌন্দর্য অফুরান। স্বাভাবিক চিন্তাধারার বাইরেও এখানে পর্যটন সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন বাঁশখালী ও রাঙ্গুনিয়ার চা-বাগানগুলো শুধু চা উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়; সঠিক ব্যবস্থাপনায় এগুলো হতে পারে কৃষি ও প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন গন্তব্য। উদ্যোগ নিলে চা-বাগানের সারি ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে পর্যটনের সংযোগ তৈরি করা সম্ভব।’

তিনি বলেন, ‘অন্যদিকে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, হাজারিখিল অভয়ারণ্য কিংবা বারৈয়াঢালা অঞ্চলের ট্রেইলগুলো চট্টগ্রামের প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের আরও একটি সম্ভাবনার কথা বলে। এখানে পর্যটনের সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। কারণ, এ ধরনের পর্যটনের গুরুত্ব এখন আন্তর্জাতিকভাবেও নতুন করে সামনে আসছে। জাতিসংঘের পর্যটন সংস্থা টেকসই গ্রামীণ পর্যটনের ক্ষেত্রে প্রকৃতি সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, অবকাঠামো ও সংযোগ, স্থানীয় পণ্য এবং পর্যটনকে স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।’

তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান এবং পর্যটন নগর কক্সবাজারের সংযোগ পয়েন্টে অবস্থিত বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্প সম্প্রসারণের অপার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আগ্রাবাদে অবস্থিত নৃ-তাত্ত্বিক জাদুঘর, শতবর্ষ পুরোনো ব্রিটিশ নির্মাণশৈলীর অনন্য নিদর্শন আগেকার সার্কিট হাউস ঘিরে গড়ে তোলা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী জিয়া স্মৃতি জাদুঘর, নতুন সার্কিট হাউস, কোর্ট হিলে অবস্থিত শতবর্ষী কোর্ট বিল্ডিং ও প্রশাসনিক ভবন, একসময়কার আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের হেডকোয়ার্টার হিসেবে পরিচিত রেলওয়ে সিআরবি ভবন এবং চারপাশে সবুজে ছায়াঘেরা নান্দনিক পরিবেশের ফৌজদারহাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ—এসবের প্রতিটিই দেশি-বিদেশি ভ্রমণপিপাসু ও ইতিহাস অন্বেষণকারীদের অন্যতম আকর্ষণ হওয়ার দাবি রাখে।

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগংয়ের (টোয়াক) সভাপতি এবং গো-ট্রিপের স্বত্বাধিকারী রাশিদুল হাসান ইমন বাসসকে বলেন, ‘দেশের মানুষের মধ্যে বেড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে। একসময় মানুষ শুধু নির্দিষ্ট মৌসুমে বেড়াতে যেত। এখন সারা বছরই সময়-সুযোগে বেড়াতে বেরিয়ে পড়ছেন। সে কারণে পর্যটনের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। চট্টগ্রামে আমাদের সংগঠনের অধীনে ১৮টি অপারেটর রয়েছে, তারা সবাই দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পর্যটকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে একটা নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তারা শহরের কাছাকাছি এলাকায় ডে-লং (দিনব্যাপী) ট্যুর দিচ্ছে, কখনো পরিবার-পরিজন নিয়ে, কখনো বন্ধু-বান্ধব মিলে।’

তিনি আরও জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান গো-ট্রিপ গত ৯ বছরে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন স্পটগুলোতে প্রায় ২ হাজার ট্রিপ দিয়েছে, যার বেশিরভাগই চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে।

পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আবু সুফিয়ান বাসসকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে পর্যটনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো একই অঞ্চলে সমুদ্র, পাহাড়, ঝরনা, লেক ও ঐতিহাসিক স্থাপনার মতো বৈচিত্র্যময় গন্তব্য থাকা। কিন্তু কোনো একটি স্পটে গিয়ে আবার ফিরে আসার বদলে পর্যটক যেন একাধিক গন্তব্য ঘুরে দেখতে পারেন, সেই ধরনের পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলা দরকার। এজন্য প্রত্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা, সড়কের মান, পর্যটকবান্ধব পরিবহন, নির্দেশনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান সরকার দেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চায়। চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে আমরা আশাবাদী, সরকার এর উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ নেবে।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘নগরীর পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে শুধু সৌন্দর্যের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না; পর্যটকদের জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতকে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন। ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সেই ধরনের অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সেখানে পর্যটকদের বসার স্থান, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, আলোকায়ন, পার্কিং ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সুবিধা প্রায়ই নিশ্চিত করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একই ধরনের সুবিধা বা ব্যবস্থা সব পর্যটন স্পটে নিশ্চিত করা গেলে চট্টগ্রামের পর্যটন আকর্ষণ আরও বাড়বে। চট্টগ্রামকে একটি নান্দনিক, সবুজ, নিরাপদ ও পর্যটনবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।’

একই প্রসঙ্গে মতামত জানতে চাইলে চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বাসসকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম তার ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে দেশি-বিদেশি পর্যটকের কাছে অতুলনীয়। কিন্তু বিগত ১৭টি বছর ফ্যাসিবাদী সরকার এই চট্টগ্রামের সবকিছুকে অবহেলা করেছে, সে কারণে পর্যটন স্পটগুলো নানা ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, প্রকৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায়নি।’

তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি পর্যটনকেন্দ্র উন্নয়ন না করে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই দেশের প্রাকৃতিক সম্ভাবনার সবটুকু কাজে লাগিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে চান। কারণ, এই দেশের প্রকৃতি এবং নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু আমাদের মূল সম্পদ। বর্তমান সরকার দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে চিহ্নিত করে পরিবেশবান্ধব ও টেকসইভাবে উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। চট্টগ্রামের সম্ভাবনাকেও এই বৃহত্তর পরিকল্পনার আওতায় কাজে লাগানো হবে।’

Share this news as a Photo Card

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

বুয়েটের ডিগ্রি, ছেড়েছেন লোভনীয় চাকরি—প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষক নায়লা শারাফ

04 October 2026

যানজট নিরসনে ইনার সার্কুলার রিং রোডের কাজ দ্রুত শেষের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

www.hostbuybd.com

বিশ্ব পর্যটন দিবস: সমুদ্র-পাহাড়-ঝরনা-ঐতিহ্যে অনন্য চট্টগ্রাম, পর্যটনে নতুন সম্ভাবনার হাতছানি

Update Time : ০৬:৩৬:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক পাশে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি, অন্য পাশে পাহাড়ের সবুজ দেয়াল। কোথাও পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসছে স্বচ্ছ ঝরনার পানি, কোথাও পাহাড়ের পাদদেশে শান্ত লেক, আবার কোথাও বিস্তীর্ণ বালিয়াড়িতে ছন্দ তুলছে ঢেউ। কোথাও রয়েছে শতবর্ষী স্থাপনা, ধর্মীয় ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি কিংবা চা-বাগানের সবুজ গালিচা। শহরের ব্যস্ততা পেরোলেই প্রকৃতি যেন বদলে দেয় তার রং।

একই ভূখণ্ডে প্রকৃতির এমন নানারূপ যেন বিশাল এক প্রদর্শনী। এই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য চট্টগ্রামকে দিয়েছে বিপুল পর্যটন সম্ভাবনা। পুরো চট্টগ্রামের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে খুলতে পারে নতুন সমৃদ্ধির দুয়ার, যা দেশের অর্থনীতিকে নিয়ে যেতে পারে নতুন উচ্চতায়।

আজ ২৭ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব পর্যটন দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য—‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে নানা আনুষ্ঠানিকতায় দিবসটি উদযাপিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা হলো পর্যটন খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল রূপান্তরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো।

দিবসটি উপলক্ষে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে আজ থেকে সপ্তাহব্যাপী নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনও দিবসটি উদযাপনে আজ র‌্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বন্দরনগরী হিসেবে চট্টগ্রামের পরিচিতি দেশের অর্থনীতিতে বহু পুরোনো। অর্থনীতির পাশাপাশি পর্যটনেও এ জেলার সম্ভাবনা বিস্তৃত। সমুদ্র, পাহাড়, ঝরনা, বন, লেক, দ্বীপ, চা-বাগান, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও ধর্মীয় ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে এখানে পর্যটনের যে বৈচিত্র্য রয়েছে, তা দেশের অন্য অনেক গন্তব্যের তুলনায় আলাদা মাত্রা তৈরি করেছে।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, ফয়’স লেক, ভাটিয়ারী লেক, বাটালি হিল, বাঁশখালী ইকোপার্ক, মহামায়া লেক, খৈয়াছড়া ঝরনা, বাঁশবাড়িয়া, গুলিয়াখালী ও পারকি সৈকত ইতিমধ্যে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এসব গন্তব্যকে ডিজিটাল রূপান্তরের আওতায় এনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভ্রমণপিপাসুদের মতে, পর্যটনের সৌন্দর্য চট্টগ্রামকে করেছে অনন্য। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে একদিকে সমুদ্রের বিস্তৃত জলরাশি, অন্যদিকে দেখা যায় বন্দরনগরীর কর্মচাঞ্চল্য। সূর্যাস্তের সময় আকাশের রং বদলে যায়, সমুদ্রের ঢেউয়ে পড়ে তার প্রতিফলন। কাছেই কর্ণফুলীর মোহনা। জাহাজের চলাচল, নদী ও সাগরের মিলন এবং উন্মুক্ত আকাশ—সব মিলিয়ে পতেঙ্গা শুধু একটি সৈকত নয়, নগরীর সঙ্গে প্রকৃতির সরাসরি সংযোগও।

পতেঙ্গার বাইরেও চট্টগ্রামের উপকূলজুড়ে রয়েছে আরও অনেক সম্ভাবনাময় সৈকত। আনোয়ারার পারকি, সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ও গুলিয়াখালী, বাঁশখালী সৈকত এবং খেজুরতলার রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। পর্যটকেরা যেদিকেই পা বাড়ান, বদলে যায় দৃশ্যপট, দেখা মেলে নতুন কিছুর। পাহাড়, বন, ঝরনা ও সমুদ্র যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা হাজারো ঝরনা অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের জন্য একেকটি আলাদা অধ্যায়।

‘চলো চট্টগ্রাম দেখি’ নামের ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সাজ্জাতুল ইসলাম তুহিন বাসসকে বলেন, ‘প্রকৃতি চট্টগ্রামকে আপন হাতে সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে, এখানকার সৌন্দর্য অফুরান। স্বাভাবিক চিন্তাধারার বাইরেও এখানে পর্যটন সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন বাঁশখালী ও রাঙ্গুনিয়ার চা-বাগানগুলো শুধু চা উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়; সঠিক ব্যবস্থাপনায় এগুলো হতে পারে কৃষি ও প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন গন্তব্য। উদ্যোগ নিলে চা-বাগানের সারি ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে পর্যটনের সংযোগ তৈরি করা সম্ভব।’

তিনি বলেন, ‘অন্যদিকে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, হাজারিখিল অভয়ারণ্য কিংবা বারৈয়াঢালা অঞ্চলের ট্রেইলগুলো চট্টগ্রামের প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের আরও একটি সম্ভাবনার কথা বলে। এখানে পর্যটনের সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। কারণ, এ ধরনের পর্যটনের গুরুত্ব এখন আন্তর্জাতিকভাবেও নতুন করে সামনে আসছে। জাতিসংঘের পর্যটন সংস্থা টেকসই গ্রামীণ পর্যটনের ক্ষেত্রে প্রকৃতি সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, অবকাঠামো ও সংযোগ, স্থানীয় পণ্য এবং পর্যটনকে স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।’

তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান এবং পর্যটন নগর কক্সবাজারের সংযোগ পয়েন্টে অবস্থিত বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্প সম্প্রসারণের অপার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আগ্রাবাদে অবস্থিত নৃ-তাত্ত্বিক জাদুঘর, শতবর্ষ পুরোনো ব্রিটিশ নির্মাণশৈলীর অনন্য নিদর্শন আগেকার সার্কিট হাউস ঘিরে গড়ে তোলা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী জিয়া স্মৃতি জাদুঘর, নতুন সার্কিট হাউস, কোর্ট হিলে অবস্থিত শতবর্ষী কোর্ট বিল্ডিং ও প্রশাসনিক ভবন, একসময়কার আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের হেডকোয়ার্টার হিসেবে পরিচিত রেলওয়ে সিআরবি ভবন এবং চারপাশে সবুজে ছায়াঘেরা নান্দনিক পরিবেশের ফৌজদারহাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ—এসবের প্রতিটিই দেশি-বিদেশি ভ্রমণপিপাসু ও ইতিহাস অন্বেষণকারীদের অন্যতম আকর্ষণ হওয়ার দাবি রাখে।

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগংয়ের (টোয়াক) সভাপতি এবং গো-ট্রিপের স্বত্বাধিকারী রাশিদুল হাসান ইমন বাসসকে বলেন, ‘দেশের মানুষের মধ্যে বেড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে। একসময় মানুষ শুধু নির্দিষ্ট মৌসুমে বেড়াতে যেত। এখন সারা বছরই সময়-সুযোগে বেড়াতে বেরিয়ে পড়ছেন। সে কারণে পর্যটনের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। চট্টগ্রামে আমাদের সংগঠনের অধীনে ১৮টি অপারেটর রয়েছে, তারা সবাই দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পর্যটকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে একটা নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তারা শহরের কাছাকাছি এলাকায় ডে-লং (দিনব্যাপী) ট্যুর দিচ্ছে, কখনো পরিবার-পরিজন নিয়ে, কখনো বন্ধু-বান্ধব মিলে।’

তিনি আরও জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান গো-ট্রিপ গত ৯ বছরে দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন স্পটগুলোতে প্রায় ২ হাজার ট্রিপ দিয়েছে, যার বেশিরভাগই চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে।

পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আবু সুফিয়ান বাসসকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে পর্যটনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো একই অঞ্চলে সমুদ্র, পাহাড়, ঝরনা, লেক ও ঐতিহাসিক স্থাপনার মতো বৈচিত্র্যময় গন্তব্য থাকা। কিন্তু কোনো একটি স্পটে গিয়ে আবার ফিরে আসার বদলে পর্যটক যেন একাধিক গন্তব্য ঘুরে দেখতে পারেন, সেই ধরনের পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলা দরকার। এজন্য প্রত্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা, সড়কের মান, পর্যটকবান্ধব পরিবহন, নির্দেশনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান সরকার দেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চায়। চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে আমরা আশাবাদী, সরকার এর উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ নেবে।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘নগরীর পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে শুধু সৌন্দর্যের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না; পর্যটকদের জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতকে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন। ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সেই ধরনের অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সেখানে পর্যটকদের বসার স্থান, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, আলোকায়ন, পার্কিং ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সুবিধা প্রায়ই নিশ্চিত করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একই ধরনের সুবিধা বা ব্যবস্থা সব পর্যটন স্পটে নিশ্চিত করা গেলে চট্টগ্রামের পর্যটন আকর্ষণ আরও বাড়বে। চট্টগ্রামকে একটি নান্দনিক, সবুজ, নিরাপদ ও পর্যটনবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।’

একই প্রসঙ্গে মতামত জানতে চাইলে চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বাসসকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম তার ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে দেশি-বিদেশি পর্যটকের কাছে অতুলনীয়। কিন্তু বিগত ১৭টি বছর ফ্যাসিবাদী সরকার এই চট্টগ্রামের সবকিছুকে অবহেলা করেছে, সে কারণে পর্যটন স্পটগুলো নানা ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, প্রকৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায়নি।’

তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি পর্যটনকেন্দ্র উন্নয়ন না করে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই দেশের প্রাকৃতিক সম্ভাবনার সবটুকু কাজে লাগিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে চান। কারণ, এই দেশের প্রকৃতি এবং নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু আমাদের মূল সম্পদ। বর্তমান সরকার দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে চিহ্নিত করে পরিবেশবান্ধব ও টেকসইভাবে উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। চট্টগ্রামের সম্ভাবনাকেও এই বৃহত্তর পরিকল্পনার আওতায় কাজে লাগানো হবে।’

Share this news as a Photo Card