Dhaka ০৯:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনাম
বিয়ে নিয়ে কেয়া পায়েলের ভাবনা, জীবনসঙ্গী হিসেবে চান বিশ্বাস ও সম্মান জনকল্যাণমূলক কাজে সরকারকে সহযোগিতা করবে জামায়াত: গোলাম পরওয়ার মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের পাশে নাগরিক উদ্যোগ নিল বিএমইউ বুয়েটের ডিগ্রি, ছেড়েছেন লোভনীয় চাকরি—প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষক নায়লা শারাফ ২৬ অক্টোবর জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্গাপূজার ছুটি বাড়ল এক দিন, ২০–২৪ অক্টোবর টানা ছুটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে ২০২৬ সালের নোবেল পেলেন ডেইসেরথ, হেগেম্যান ও নাগেল বিসিআইসির চেয়ারম্যান হলেন অতিরিক্ত সচিব মো. বাবুল মিঞা শিক্ষকতা ‘উপায়হীন বিকল্প’ নয়, মেধাবীদের প্রথম পছন্দ করতে হবে: তারেক রহমান ধানমন্ডিতে যাত্রা শুরু করল আকিজ ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার

ভ্যানিলাসহ সমন্বিত কৃষি খামার করে সফল বেগমপুরের হুমায়ুন

  • Md Sadikul islam (shopnil)
  • Update Time : ০৮:৫৫:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১৫ Time View

কৃষিতে বৈচিত্র্য ও আধুনিকতার ছোঁয়া এনে সফলতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর কলোনিপাড়ার হুমায়ুন কবীর ফরাজী (৫১)।

সাধারণ সবজি ও ফল চাষের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে চুয়াডাঙ্গায় প্রথমবারের মতো ভ্যানিলা চাষ করে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন তিনি। চার বছর নিবিড় পরিচর্যার পর এবার তাঁর ভ্যানিলা গাছে ফুল থেকে ফল এসেছে। বরবটির মতো দেখতে বিদেশি এই ফল দেখতে অনেকেই ভিড় করছেন তাঁর খামারে।

হুমায়ুন কবীর তাঁর সমন্বিত খামারের নাম দিয়েছেন ‘নিউ কামাল এগ্রো’। ১৮ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা এই সমন্বিত কৃষি খামারে বর্তমানে ভ্যানিলা, কাশ্মীরি কলা, পেঁপে ও ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি পালন করা হচ্ছে ছাগল, দুম্বা, ভেড়া ও গরু।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার দর্শনা থানার বেগমপুর গ্রামের মৃত কামাল উদ্দীন ফরাজী ও রাশেদা বেগমের পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সেজো ছেলে হুমায়ুন কবীর। তিনি দুই সন্তানের বাবা।

চুয়াডাঙ্গা জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে বেগমপুর কলোনিপাড়া গ্রাম। গ্রামের রাস্তার ধারে হুমায়ুনের ‘নিউ কামাল এগ্রো’ খামারে গিয়ে দেখা যায়, এক প্রান্তে থাকার জন্য দুটি কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। এর এক পাশে ডেইরি খামার, অন্য পাশে দুম্বা, ছাগল ও ভেড়ার খামার।

আরও কিছুটা সামনে এগোলেই ভ্যানিলা বাগান। ১০ কাঠা জায়গা নেট দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। পরিবেশ কিছুটা স্যাঁতসেঁতে। নেটের ভেতরে ৬০০ থেকে ৭০০ পিলারে লতা–পাতা ছড়িয়ে রয়েছে ভ্যানিলা গাছ। গাছের আগার দিকে ঝুলছে ভ্যানিলার ফল।

প্রতিটি ফলের দৈর্ঘ্য ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি। দেখতে অনেকটা বরবটি সবজির মতো সবুজ রঙের এই ফল। আর কিছুদিন পর ফলগুলো হালকা বাদামি রং ধারণ করলে গাছ থেকে সংগ্রহ করা যাবে। ভ্যানিলা বাগানের পাশেই রয়েছে ড্রাগন ফল ও কাশ্মীরি কলার বাগান।

বাসসের সঙ্গে আলাপকালে হুমায়ুন কবীর জানান, কর্মজীবনে দীর্ঘদিন আম ও বিভিন্ন ধরনের ফলের ব্যবসা করেছেন তিনি। ঢাকার কাওরান বাজারে তাঁর বাবার ‘কুষ্টিয়া ভান্ডার’ নামে একটি ফলের আড়ত রয়েছে। সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ২০ বছর আগে আধুনিক ফল চাষে নামার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

সেই থেকে নিজ জেলায় বিভিন্ন ধরনের ফল চাষ শুরু করেন হুমায়ুন। শুরুতে তিনি লিচু, ড্রাগন, মার্লবেরি ও অ্যাভোকাডোর চাষ করেন। এরপর চার বছর আগে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পেনিফোলিয়া জাতের ভ্যানিলার চারা সংগ্রহ করেন।

পরীক্ষামূলকভাবে নিজের ১০ কাঠা জমিতে পিলার স্থাপন করে গ্রিনহাউস পদ্ধতিতে ভ্যানিলা চাষ শুরু করেন তিনি। চার বছরে পুরো চাষপ্রক্রিয়ায় তাঁর প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। নানা চড়াই–উতরাই পেরিয়ে এবার প্রথমবারের মতো ভ্যানিলা গাছে ফুল থেকে ফল এসেছে।

চলতি বছর বাগানের ভ্যানিলা বিক্রি করে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় হবে বলে আশা করছেন হুমায়ুন কবীর।

তিনি বলেন, ‘১০ কাঠা জমিতে ভ্যানিলা চাষ করেছি। ২০২২ সালেই এই চারাগুলো আমি সংগ্রহ করি। ইউটিউবে এবং ভ্যানিলার প্রজেক্ট প্রোগ্রামে আমি অংশগ্রহণ করি। প্রথমত পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে এই চারাগুলো দেখি ও রোপণের পদ্ধতি জেনে নিই। সেখানে থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি চারাগুলো ২০২২ সালে লাগিয়েছি। এখন এই গাছগুলোতে ফুল ও ফল এসেছে। এই ফলগুলো এক থেকে দেড় মাস পরে উত্তোলন করা যাবে।’

হুমায়ুন কবীর জানান, ভ্যানিলার ভেতরের রং অনেকটা সুরমার রঙের মতো। চলতি মৌসুমে তাঁর জমি থেকে প্রায় ১২০ কেজি ভ্যানিলা উৎপাদন হবে বলে আশা করছেন তিনি।

জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে প্রকারভেদে প্রতি কেজি ভ্যানিলা ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকায় ফল বিক্রি করা সম্ভব হবে।

ভ্যানিলা চাষে অনেক ধৈর্যের প্রয়োজন বলে জানান হুমায়ুন। তাঁর ভ্যানিলা বাগান পরিচর্যার জন্য প্রতিদিন চারজন শ্রমিক কাজ করেন। এ ছাড়া অন্যান্য কাজে আরও ৬ থেকে ৭ জন শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন।

হুমায়ুন কবীরের মতে, এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি ফসল। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ভ্যানিলা চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশের আবহাওয়া ভ্যানিলা চাষের জন্য পুরোপুরি উপযোগী নয়। তবে গ্রিনহাউস পদ্ধতিতে ছায়াযুক্ত স্থানে এর চাষ সম্ভব। ভ্যানিলা চাষের জন্য সহনীয় তাপমাত্রা ১৬ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে হয়।

হুমায়ুন কবীর ২০২২ সালে এক লাখ টাকা খরচ করে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ১৫০ মিটার ভ্যানিলা লতা নিয়ে আসেন। পরে সেগুলো একটি করে গিঁট রেখে ছোট ছোট অংশে কেটে প্রায় এক হাজার চারা তৈরি করেন।

চার মাস চারা প্রস্তুত করার পর সেগুলো জমিতে রোপণ করা হয়। এর আগে বেলে–দোআঁশ মাটি ও জৈব সার মিশিয়ে জমি প্রস্তুত করেন তিনি। এরপর সেই মাটিতে ভ্যানিলার চারা রোপণ করা হয়।

ভ্যানিলা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের ফসল হওয়ায় প্রতিনিয়ত পানি স্প্রে করতে হয়। সময়ের সঙ্গে গাছ বড় হওয়ার পাশাপাশি এর লতা ও পাতা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত ভ্যানিলা গাছ রোপণের ৪ থেকে ৫ বছর পর ফল দিতে শুরু করে।

বছরে দুইবার ফল ধরে ভ্যানিলা গাছে। সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ফলের পরিমাণ বেশি থাকে। ফল সংগ্রহের পর গাছের ডগা কেটে চারা তৈরি করতে হয়। সেই চারা আবার জমিতে রোপণ করা যায়।

ভ্যানিলায় তেমন রোগবালাই দেখা যায় না। তবে হালকা রোগবালাই দেখা দিলে কিছু ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে তা দমন করা যায়।

এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে ভ্যানিলা গাছে ফুল আসে। এরপর পরিচর্যা করলে দ্রুত ফুল থেকে ফলে রূপান্তরিত হয়। অক্টোবরের মধ্যেই ফলগুলো পরিপক্ব হয়ে যায়।

গাছ থেকে ফল সংগ্রহের পর ৬০ থেকে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তিন মিনিট করে সেঁক বা সেদ্ধ করা হয়। এভাবে তিনবার সেঁক দেওয়া হয়। এরপর সেদ্ধ ফলগুলো রোদে শুকিয়ে বাজারজাত করা হয়।

প্রতি কেজি শুকনা ভ্যানিলা ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেল ও বড় বড় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ভ্যানিলার ক্রেতা।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের কলোনিপাড়ায় হুমায়ুন কবীর ফরাজী নিজ উদ্যোগে ১০ কাঠা জমিতে ভ্যানিলা চাষ করেছেন। চার বছর পর এবার তাঁর গাছে ফুল ও ফল এসেছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই তিনি সব ফল সংগ্রহ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিদ্যমান প্রযুক্তি সম্পর্কে আরও জানা এবং গবেষকেরা এ নিয়ে আরও গবেষণা করলে ভবিষ্যতে ভ্যানিলা চাষ সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।

মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, ভ্যানিলা অত্যন্ত উচ্চমূল্যের একটি ফসল। এর চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে এবং বাইরে থেকে ভ্যানিলা আমদানির খরচও কমবে। একই সঙ্গে এ–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

Share this news as a Photo Card

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

বিয়ে নিয়ে কেয়া পায়েলের ভাবনা, জীবনসঙ্গী হিসেবে চান বিশ্বাস ও সম্মান

04 October 2026

ধানমন্ডিতে যাত্রা শুরু করল আকিজ ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার

www.hostbuybd.com

ভ্যানিলাসহ সমন্বিত কৃষি খামার করে সফল বেগমপুরের হুমায়ুন

Update Time : ০৮:৫৫:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কৃষিতে বৈচিত্র্য ও আধুনিকতার ছোঁয়া এনে সফলতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর কলোনিপাড়ার হুমায়ুন কবীর ফরাজী (৫১)।

সাধারণ সবজি ও ফল চাষের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে চুয়াডাঙ্গায় প্রথমবারের মতো ভ্যানিলা চাষ করে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন তিনি। চার বছর নিবিড় পরিচর্যার পর এবার তাঁর ভ্যানিলা গাছে ফুল থেকে ফল এসেছে। বরবটির মতো দেখতে বিদেশি এই ফল দেখতে অনেকেই ভিড় করছেন তাঁর খামারে।

হুমায়ুন কবীর তাঁর সমন্বিত খামারের নাম দিয়েছেন ‘নিউ কামাল এগ্রো’। ১৮ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা এই সমন্বিত কৃষি খামারে বর্তমানে ভ্যানিলা, কাশ্মীরি কলা, পেঁপে ও ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি পালন করা হচ্ছে ছাগল, দুম্বা, ভেড়া ও গরু।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার দর্শনা থানার বেগমপুর গ্রামের মৃত কামাল উদ্দীন ফরাজী ও রাশেদা বেগমের পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সেজো ছেলে হুমায়ুন কবীর। তিনি দুই সন্তানের বাবা।

চুয়াডাঙ্গা জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে বেগমপুর কলোনিপাড়া গ্রাম। গ্রামের রাস্তার ধারে হুমায়ুনের ‘নিউ কামাল এগ্রো’ খামারে গিয়ে দেখা যায়, এক প্রান্তে থাকার জন্য দুটি কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। এর এক পাশে ডেইরি খামার, অন্য পাশে দুম্বা, ছাগল ও ভেড়ার খামার।

আরও কিছুটা সামনে এগোলেই ভ্যানিলা বাগান। ১০ কাঠা জায়গা নেট দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। পরিবেশ কিছুটা স্যাঁতসেঁতে। নেটের ভেতরে ৬০০ থেকে ৭০০ পিলারে লতা–পাতা ছড়িয়ে রয়েছে ভ্যানিলা গাছ। গাছের আগার দিকে ঝুলছে ভ্যানিলার ফল।

প্রতিটি ফলের দৈর্ঘ্য ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি। দেখতে অনেকটা বরবটি সবজির মতো সবুজ রঙের এই ফল। আর কিছুদিন পর ফলগুলো হালকা বাদামি রং ধারণ করলে গাছ থেকে সংগ্রহ করা যাবে। ভ্যানিলা বাগানের পাশেই রয়েছে ড্রাগন ফল ও কাশ্মীরি কলার বাগান।

বাসসের সঙ্গে আলাপকালে হুমায়ুন কবীর জানান, কর্মজীবনে দীর্ঘদিন আম ও বিভিন্ন ধরনের ফলের ব্যবসা করেছেন তিনি। ঢাকার কাওরান বাজারে তাঁর বাবার ‘কুষ্টিয়া ভান্ডার’ নামে একটি ফলের আড়ত রয়েছে। সেখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ২০ বছর আগে আধুনিক ফল চাষে নামার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

সেই থেকে নিজ জেলায় বিভিন্ন ধরনের ফল চাষ শুরু করেন হুমায়ুন। শুরুতে তিনি লিচু, ড্রাগন, মার্লবেরি ও অ্যাভোকাডোর চাষ করেন। এরপর চার বছর আগে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পেনিফোলিয়া জাতের ভ্যানিলার চারা সংগ্রহ করেন।

পরীক্ষামূলকভাবে নিজের ১০ কাঠা জমিতে পিলার স্থাপন করে গ্রিনহাউস পদ্ধতিতে ভ্যানিলা চাষ শুরু করেন তিনি। চার বছরে পুরো চাষপ্রক্রিয়ায় তাঁর প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। নানা চড়াই–উতরাই পেরিয়ে এবার প্রথমবারের মতো ভ্যানিলা গাছে ফুল থেকে ফল এসেছে।

চলতি বছর বাগানের ভ্যানিলা বিক্রি করে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় হবে বলে আশা করছেন হুমায়ুন কবীর।

তিনি বলেন, ‘১০ কাঠা জমিতে ভ্যানিলা চাষ করেছি। ২০২২ সালেই এই চারাগুলো আমি সংগ্রহ করি। ইউটিউবে এবং ভ্যানিলার প্রজেক্ট প্রোগ্রামে আমি অংশগ্রহণ করি। প্রথমত পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে এই চারাগুলো দেখি ও রোপণের পদ্ধতি জেনে নিই। সেখানে থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি চারাগুলো ২০২২ সালে লাগিয়েছি। এখন এই গাছগুলোতে ফুল ও ফল এসেছে। এই ফলগুলো এক থেকে দেড় মাস পরে উত্তোলন করা যাবে।’

হুমায়ুন কবীর জানান, ভ্যানিলার ভেতরের রং অনেকটা সুরমার রঙের মতো। চলতি মৌসুমে তাঁর জমি থেকে প্রায় ১২০ কেজি ভ্যানিলা উৎপাদন হবে বলে আশা করছেন তিনি।

জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে প্রকারভেদে প্রতি কেজি ভ্যানিলা ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকায় ফল বিক্রি করা সম্ভব হবে।

ভ্যানিলা চাষে অনেক ধৈর্যের প্রয়োজন বলে জানান হুমায়ুন। তাঁর ভ্যানিলা বাগান পরিচর্যার জন্য প্রতিদিন চারজন শ্রমিক কাজ করেন। এ ছাড়া অন্যান্য কাজে আরও ৬ থেকে ৭ জন শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন।

হুমায়ুন কবীরের মতে, এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি ফসল। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ভ্যানিলা চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশের আবহাওয়া ভ্যানিলা চাষের জন্য পুরোপুরি উপযোগী নয়। তবে গ্রিনহাউস পদ্ধতিতে ছায়াযুক্ত স্থানে এর চাষ সম্ভব। ভ্যানিলা চাষের জন্য সহনীয় তাপমাত্রা ১৬ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে হয়।

হুমায়ুন কবীর ২০২২ সালে এক লাখ টাকা খরচ করে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ১৫০ মিটার ভ্যানিলা লতা নিয়ে আসেন। পরে সেগুলো একটি করে গিঁট রেখে ছোট ছোট অংশে কেটে প্রায় এক হাজার চারা তৈরি করেন।

চার মাস চারা প্রস্তুত করার পর সেগুলো জমিতে রোপণ করা হয়। এর আগে বেলে–দোআঁশ মাটি ও জৈব সার মিশিয়ে জমি প্রস্তুত করেন তিনি। এরপর সেই মাটিতে ভ্যানিলার চারা রোপণ করা হয়।

ভ্যানিলা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের ফসল হওয়ায় প্রতিনিয়ত পানি স্প্রে করতে হয়। সময়ের সঙ্গে গাছ বড় হওয়ার পাশাপাশি এর লতা ও পাতা চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত ভ্যানিলা গাছ রোপণের ৪ থেকে ৫ বছর পর ফল দিতে শুরু করে।

বছরে দুইবার ফল ধরে ভ্যানিলা গাছে। সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ফলের পরিমাণ বেশি থাকে। ফল সংগ্রহের পর গাছের ডগা কেটে চারা তৈরি করতে হয়। সেই চারা আবার জমিতে রোপণ করা যায়।

ভ্যানিলায় তেমন রোগবালাই দেখা যায় না। তবে হালকা রোগবালাই দেখা দিলে কিছু ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে তা দমন করা যায়।

এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে ভ্যানিলা গাছে ফুল আসে। এরপর পরিচর্যা করলে দ্রুত ফুল থেকে ফলে রূপান্তরিত হয়। অক্টোবরের মধ্যেই ফলগুলো পরিপক্ব হয়ে যায়।

গাছ থেকে ফল সংগ্রহের পর ৬০ থেকে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তিন মিনিট করে সেঁক বা সেদ্ধ করা হয়। এভাবে তিনবার সেঁক দেওয়া হয়। এরপর সেদ্ধ ফলগুলো রোদে শুকিয়ে বাজারজাত করা হয়।

প্রতি কেজি শুকনা ভ্যানিলা ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেল ও বড় বড় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ভ্যানিলার ক্রেতা।

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের কলোনিপাড়ায় হুমায়ুন কবীর ফরাজী নিজ উদ্যোগে ১০ কাঠা জমিতে ভ্যানিলা চাষ করেছেন। চার বছর পর এবার তাঁর গাছে ফুল ও ফল এসেছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই তিনি সব ফল সংগ্রহ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিদ্যমান প্রযুক্তি সম্পর্কে আরও জানা এবং গবেষকেরা এ নিয়ে আরও গবেষণা করলে ভবিষ্যতে ভ্যানিলা চাষ সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।

মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, ভ্যানিলা অত্যন্ত উচ্চমূল্যের একটি ফসল। এর চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে এবং বাইরে থেকে ভ্যানিলা আমদানির খরচও কমবে। একই সঙ্গে এ–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

Share this news as a Photo Card