রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানো, যানজট কমানো এবং যাত্রীসেবা উন্নত করতে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার আওতায় বর্তমানে চালু থাকা ৯৮টি বাস রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি সমন্বিত রুটে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে আগামীকাল রোববার প্রস্তাবিত ৩২টি রুটের মধ্যে ছয়টির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে বাকি রুটগুলোও এ ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় একই সড়কে একাধিক কোম্পানির বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, অতিরিক্ত বাস চলাচল এবং নির্ধারিত স্টপেজ না মানার মতো সমস্যা রয়েছে। একই এলাকার বিভিন্ন বাস কোম্পানি যাত্রী সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় নামায় সড়কে বিশৃঙ্খলা ও যানজট বাড়ছে। অন্যদিকে অনেক এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত বাস নেই।
এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে যাত্রী চাহিদা, সড়কের ধারণক্ষমতা ও যানবাহন চলাচলের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাস রুট পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের আওতায় এ পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি নির্ধারিত রুটে একটি কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা কমবে, বাস চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং যাত্রীসেবার মান বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান বাসসকে বলেন, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করতেই বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ঢাকায় ৯৮টি সচল বাস রুট রয়েছে। এসব রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি সমন্বিত রুটে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, যাত্রীদের প্রকৃত চাহিদা, সড়কের ধারণক্ষমতা ও যানবাহন চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে একটি পরিকল্পিত, নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করাই তাঁদের লক্ষ্য।
বাস রুট রেশনালাইজেশন বলতে যাত্রীদের চাহিদা, সড়কের ধারণক্ষমতা ও যানজট বিবেচনায় নিয়ে বাসের রুটগুলো পরিকল্পিতভাবে পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় করাকে বোঝায়। এটি শুধু বাসের সংখ্যা কমানো বা রুট পরিবর্তনের বিষয় নয়। বরং বাসের সংখ্যা, চলাচলের পথ, স্টপেজ, সময়সূচি ও পরিচালনপদ্ধতিকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার প্রক্রিয়া।
ডিটিসিএ সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর বাস রুট পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ প্রথম নেওয়া হয় ২০১১ সালে। সে সময় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় বোর্ডের (ডিটিসিবি) মাধ্যমে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরে ২০১৯ সাল থেকে ডিটিসিএ আগের বিভিন্ন সমীক্ষা পর্যালোচনা করে হালনাগাদ পরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করে। প্রাথমিকভাবে ৪২টি রুটের প্রস্তাব করা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, বাসমালিক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও পর্যালোচনার ভিত্তিতে ৩২টি রুটের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো হয়।
পরিকল্পনা তৈরিতে ব্যাপক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সচল থাকা ৯৮টি বাস রুটের প্রতিটিতে ১৮টি ট্রিপের যাত্রী ওঠানামা পর্যবেক্ষণ করে বোর্ডিং-অ্যালাইটিং সার্ভে পরিচালনা করা হয়। এতে ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩৫ হাজারের বেশি বাসযাত্রীর অরিজিন-ডেস্টিনেশন সার্ভে করা হয়েছে। অর্থাৎ যাত্রীরা কোথা থেকে যাত্রা শুরু করেন এবং কোথায় যান, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা মহানগরীর ৭২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন গণনা বা ট্রাফিক কাউন্ট করা হয়েছে। প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের বর্তমান অবস্থা নিরূপণে ড্রোনের মাধ্যমে ছবি সংগ্রহ, সড়কের অবকাঠামোগত পর্যালোচনা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং তৈরি করা হয়েছে।
এসব তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে সফটওয়্যারের মাধ্যমে একটি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট মডেল তৈরি করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে যাত্রী চলাচলের প্রবণতা, রুটের প্রয়োজনীয়তা এবং পরিবহন নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ডিটিসিএর পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ৩২টি রুটের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩৭ থেকে ৩৮ লাখ যাত্রীর যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে। এটি মোট পারসন ট্রিপের প্রায় ৮ শতাংশ। প্রস্তাবিত রুটগুলোর গড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যমান কোনো না কোনো বাস রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে বিদ্যমান বাস চলাচলের পথ ও পরিবহন অবকাঠামো ব্যবহার করেই নতুন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে মনে করছেন পরিকল্পনাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ঢাকার বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ধ্রুব আলম বাসসকে বলেন, ‘এই পরিকল্পনা কোনো অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত নয়। আমরা ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সচল ৯৮টি বাস রুটের ওপর বিভিন্ন ধরনের জরিপ পরিচালনা করেছি। ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর বোর্ডিং-অ্যালাইটিং তথ্য এবং ৩৫ হাজারের বেশি যাত্রীর অরিজিন-ডেস্টিনেশন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া মহানগরীর ৭২টি স্থানে একটানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন গণনা করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের অবকাঠামোগত অবস্থাও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব তথ্য সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে ৩২টি রুটের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। তাঁদের লক্ষ্য, যেখানে যাত্রীর চাহিদা বেশি সেখানে পর্যাপ্ত বাস নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় রুটের পুনরাবৃত্তি কমিয়ে আনা।
পরিকল্পনায় বিমানবন্দর, মিরপুর-১০, কুড়িল, গাবতলী, মহাখালী, ফার্মগেট, বাড্ডা ও যাত্রাবাড়ীকে কেন্দ্র করে একাধিক রুটের সংযোগ রাখা হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে চালু হতে যাওয়া ছয়টি বাস রুট হলো—
১. গাজীপুরের শিববাড়ী চৌরাস্তা থেকে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত, আবদুল্লাহপুর হয়ে।
২. মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে চুলকুটিয়া পর্যন্ত, সায়েন্স ল্যাব হয়ে।
৩. মোহাম্মদপুরের বসিলার ঘাটারচর থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার পর্যন্ত, শাহবাগ ও মৎস্য ভবন হয়ে।
৪. মোহাম্মদপুরের বসিলা থেকে নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোড কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত, সায়েন্স ল্যাব ও জিগাতলা হয়ে।
৫. মোহাম্মদপুরের ঘাটারচর থেকে আবদুল্লাহপুরের ধউর সেতু পর্যন্ত, মিরপুর-১০ হয়ে।
৬. টঙ্গী কলেজগেট থেকে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত, আবদুল্লাহপুর হয়ে।
প্রস্তাবিত প্রধান রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে গাজীপুরের শিববাড়ী থেকে আজিমপুর, মিরপুর চিড়িয়াখানা থেকে কেরানীগঞ্জ, ঘাটারচর থেকে ডেমরা ও কাঁচপুর এবং ঘাটারচর থেকে মিরপুর হয়ে আবদুল্লাহপুরের ধউর পর্যন্ত। এসব রুটে ৭০ থেকে ২৫০টি পর্যন্ত নন-এসি বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি টঙ্গী কলেজগেট থেকে আজিমপুর পর্যন্ত ২২ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার রুটে ২০টি এসি বাস চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া ফার্মগেট-পলাশী, মোহাম্মদপুরকেন্দ্রিক এবং উত্তরা এলাকায় তিনটি চক্রাকার বাস সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি রুটে ২০টি করে বাস পরিচালনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় ঢাকা চাকা, রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ, ফোর স্টার বাস লাইন ও পিএনপি সিটি সার্ভিসসহ কয়েকটি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বাস রাখার জন্য বিভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণের প্রস্তাবও রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























