Dhaka ১০:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনাম
বিয়ে নিয়ে কেয়া পায়েলের ভাবনা, জীবনসঙ্গী হিসেবে চান বিশ্বাস ও সম্মান জনকল্যাণমূলক কাজে সরকারকে সহযোগিতা করবে জামায়াত: গোলাম পরওয়ার মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের পাশে নাগরিক উদ্যোগ নিল বিএমইউ বুয়েটের ডিগ্রি, ছেড়েছেন লোভনীয় চাকরি—প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষক নায়লা শারাফ ২৬ অক্টোবর জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্গাপূজার ছুটি বাড়ল এক দিন, ২০–২৪ অক্টোবর টানা ছুটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে ২০২৬ সালের নোবেল পেলেন ডেইসেরথ, হেগেম্যান ও নাগেল বিসিআইসির চেয়ারম্যান হলেন অতিরিক্ত সচিব মো. বাবুল মিঞা শিক্ষকতা ‘উপায়হীন বিকল্প’ নয়, মেধাবীদের প্রথম পছন্দ করতে হবে: তারেক রহমান ধানমন্ডিতে যাত্রা শুরু করল আকিজ ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার

জনগণের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাই: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, দলমত, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের লক্ষ্য।

বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় দেওয়া তাঁর প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়েই উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সামনে এখন সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।

তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য সুযোগ সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, স্টার্টআপ উদ্যোগে সহায়তার জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে জোর

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়।

তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। তাই নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের পরিকল্পনার অগ্রভাগে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে।

অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক।

বিভিন্ন খাতের এসব কার্ডকে সমন্বিত করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে এবারই শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জিডিপির বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাগ ও স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’কে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত জুনে সারাদেশে আয়োজিত মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার শহর ও গ্রামের উন্নয়ন বৈষম্য কমানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কাজ করছে। জনগণের কাছে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচির সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’ নীতির ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশের পরোক্ষ মিল রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রযুক্তির বৈষম্য দূর করার আহ্বান

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক।’

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশের সুফল ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। এ উত্তরণকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।

আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো দেশ একা এগিয়ে যেতে পারে না। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা থেকেও পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও নির্ভরতার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।

শান্তি ও মানবিক বিশ্বের পক্ষে বাংলাদেশ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংঘাতের সমাধান হতে হবে আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে।

তিনি বলেন, বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত। জাতিসংঘকে এমন একটি সমঝোতামূলক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রতি সমর্থন জানান।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চান

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

‘রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত’ উল্লেখ করে তিনি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়াকে সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।

জলবায়ু ন্যায়বিচারে জোর

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী কপ-৩১-এ জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ক্লিন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা ও খরা মোকাবিলায় সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ ও মিঠা পানির প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ এবং আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।

নিরাপদ অভিবাসন ও শান্তিরক্ষা

নিয়মিত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ কর্মসূচির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: অ্যা ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বহুপক্ষীয়তার প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তরুণরা যাতে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পায়, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারে এবং প্রতিটি শিশু তার সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়—এমন একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ কাজ করছে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

Share this news as a Photo Card

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

বিয়ে নিয়ে কেয়া পায়েলের ভাবনা, জীবনসঙ্গী হিসেবে চান বিশ্বাস ও সম্মান

04 October 2026

ধানমন্ডিতে যাত্রা শুরু করল আকিজ ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার

www.hostbuybd.com

জনগণের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাই: প্রধানমন্ত্রী

Update Time : ০৭:১৩:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, দলমত, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের লক্ষ্য।

বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় দেওয়া তাঁর প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়েই উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সামনে এখন সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।

তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য সুযোগ সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, স্টার্টআপ উদ্যোগে সহায়তার জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে জোর

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়।

তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। তাই নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের পরিকল্পনার অগ্রভাগে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে।

অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক।

বিভিন্ন খাতের এসব কার্ডকে সমন্বিত করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে এবারই শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জিডিপির বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাগ ও স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’কে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত জুনে সারাদেশে আয়োজিত মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার শহর ও গ্রামের উন্নয়ন বৈষম্য কমানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কাজ করছে। জনগণের কাছে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচির সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’ নীতির ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশের পরোক্ষ মিল রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রযুক্তির বৈষম্য দূর করার আহ্বান

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক।’

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশের সুফল ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। এ উত্তরণকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।

আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো দেশ একা এগিয়ে যেতে পারে না। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা থেকেও পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও নির্ভরতার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।

শান্তি ও মানবিক বিশ্বের পক্ষে বাংলাদেশ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংঘাতের সমাধান হতে হবে আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে।

তিনি বলেন, বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত। জাতিসংঘকে এমন একটি সমঝোতামূলক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রতি সমর্থন জানান।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চান

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

‘রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত’ উল্লেখ করে তিনি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়াকে সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।

জলবায়ু ন্যায়বিচারে জোর

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী কপ-৩১-এ জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ক্লিন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা ও খরা মোকাবিলায় সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ ও মিঠা পানির প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ এবং আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।

নিরাপদ অভিবাসন ও শান্তিরক্ষা

নিয়মিত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ কর্মসূচির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: অ্যা ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বহুপক্ষীয়তার প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তরুণরা যাতে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পায়, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারে এবং প্রতিটি শিশু তার সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়—এমন একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ কাজ করছে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

Share this news as a Photo Card