Dhaka ০৫:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনাম
মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের পাশে নাগরিক উদ্যোগ নিল বিএমইউ বুয়েটের ডিগ্রি, ছেড়েছেন লোভনীয় চাকরি—প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষক নায়লা শারাফ ২৬ অক্টোবর জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্গাপূজার ছুটি বাড়ল এক দিন, ২০–২৪ অক্টোবর টানা ছুটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে ২০২৬ সালের নোবেল পেলেন ডেইসেরথ, হেগেম্যান ও নাগেল বিসিআইসির চেয়ারম্যান হলেন অতিরিক্ত সচিব মো. বাবুল মিঞা শিক্ষকতা ‘উপায়হীন বিকল্প’ নয়, মেধাবীদের প্রথম পছন্দ করতে হবে: তারেক রহমান ধানমন্ডিতে যাত্রা শুরু করল আকিজ ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডারে ২৫২ টাকা বাড়ল, নতুন দাম ১,৮৩৭ টাকা ডিআইজি-অতিরিক্ত ডিআইজিসহ পুলিশের ২৪ কর্মকর্তাকে বদলি

এআই দিয়ে ছবি বানাতে খরচ হচ্ছে বিপুল পানি, বিদ্যুৎ

মুঠোফোনে কয়েকটি শব্দ লিখে দিলেই চোখের পলকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) একটি ছবি তৈরি করে দিচ্ছে। কয়েক দিন ধরে আশির দশকের ছবি তৈরির একটি ট্রেন্ডও দেখা যাচ্ছে। কাজটি এখন এত সহজ হয়ে গেছে যে এর পেছনের জটিলতা নিয়ে খুব একটা ভাবতে হয় না। কিন্তু একটি ‘কমান্ড’ বা নির্দেশ পালন করতে গিয়ে পর্দার আড়ালে খরচ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ পানি ও বিদ্যুৎ।

প্রশ্ন উঠতে পারে, একজন মানুষ ঘরে বসে স্মার্টফোনে এআই ব্যবহার করছেন, অথচ তাঁর তো এক ফোঁটা পানিও খরচ হচ্ছে না। তাহলে এআই কোম্পানিগুলোর এত পানি প্রয়োজন কেন? এমনকি এই পানির ব্যবহার কমাতে সমুদ্রের তলদেশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের কথাও ভাবা হচ্ছে। এর পেছনের কারণ কী, তা জানা যাক।

ধরা যাক, আপনি চ্যাটজিপিটি বা মিডজার্নির মতো কোনো এআই টুলে লিখলেন, ‘পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যাস্তের একটি ছবি বানাও।’ আপনার এই নির্দেশ ইন্টারনেটের মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দূরের কোনো ডেটা সেন্টারে পৌঁছে যায়। এসব ডেটা সেন্টার মূলত বিশাল আকারের কম্পিউটার কারখানা। সেখানে হাজার হাজার শক্তিশালী সার্ভার দিনরাত একটানা কাজ করে আপনার ছবিটি তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে আপনার ফোন বা ল্যাপটপের নিজস্ব কোনো ভূমিকা নেই।

সমস্যা হলো, হাজার হাজার সার্ভার একসঙ্গে জটিল হিসাব-নিকাশ করার সময় প্রচণ্ড গরম হয়ে ওঠে। যথাযথভাবে তাপ সরাতে না পারলে দামি যন্ত্রগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এসব উত্তপ্ত সার্ভার ঠান্ডা রাখতেই প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ পানির।

বেশির ভাগ বড় ডেটা সেন্টার সার্ভার ঠান্ডা রাখতে ‘বাষ্পীভবন শীতলীকরণ (ইভাপোরেটিভ কুলিং)’ পদ্ধতি ব্যবহার করে। বিষয়টি অনেকটা আমাদের শরীরের ঘামার মতো। গরমের দিনে শরীরের ঘাম বাতাসে শুকিয়ে গেলে যেমন ঠান্ডা লাগে, ডেটা সেন্টারের পদ্ধতিটিও অনেকটা তেমন। গরম সার্ভার ঠান্ডা করার জন্য সেগুলোর পাশ দিয়ে ঠান্ডা পানি প্রবাহিত করা হয়। সেই পানি সার্ভারের তাপ শুষে নিয়ে গরম হয়ে যায়। এরপর গরম পানিকে কুলিং টাওয়ারের বাতাস ও বিশেষ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পাঠানো হয়। সেখানে পানির কিছু অংশ বাষ্প হয়ে বাতাসে উড়ে যায়। এই বাষ্পীভবনের কারণে বাকি পানিটুকু আবার ঠান্ডা হয়ে যায়। এরপর সেই ঠান্ডা পানি আবার সার্ভারে পাঠানো হয়।

এই পদ্ধতিতে পানি খুব একটা সাশ্রয় হয় না; বরং প্রচুর পানির অপচয় ঘটে। এর প্রধান কারণ দুটি। প্রথমত, গরম পানি ঠান্ডা করার সময় এর একটি বড় অংশ বাষ্প হয়ে বাতাসে উড়ে যায়। ফলে ঘাটতি পূরণ করতে নিয়মিত নতুন পানি সরবরাহ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার পর অবশিষ্ট পানিতে লবণ ও খনিজ পদার্থের ঘনত্ব বেড়ে যায়। এসব খনিজযুক্ত পানি বারবার ব্যবহার করলে সার্ভার ও পাইপে আয়রনের আস্তরণ জমে যন্ত্রপাতির ক্ষতি হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট সময় পর ওই ঘন পানি ফেলে দিয়ে আবার নতুন সুপেয় পানি যোগ করতে হয়।

পানির খরচটা আসলে কত

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রকৌশল সাময়িকী আইইইই স্পেকট্রামে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে করা একটি গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, জিপিটি-৩ মডেল দিয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ শব্দের একটি সাধারণ লেখা তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গড় ডেটা সেন্টারে প্রায় ১৭ মিলিলিটার পানি খরচ হতো। এর মধ্যে সরাসরি কুলিংয়ে লাগে পৌনে ২ মিলিলিটার, আর বাকিটা লাগে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। তবে ছবি তৈরিতে পানির নির্দিষ্ট কোনো হিসাব ওই প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।

ছবি তৈরিতে পানির খরচ নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়। জ্বালানি খরচের উপাত্তের ভিত্তিতে করা কিছু হিসাবে একটি ছবি তৈরিতে গড়ে প্রায় ২৩ মিলিলিটার পানি খরচের কথা বলা হয়েছে। আবার অন্য কিছু বিশ্লেষণে এই পরিমাণ ৫ থেকে ৬০ মিলিলিটার, এমনকি তারও বেশি হতে দেখা গেছে। হিসাবের পদ্ধতির পার্থক্যের কারণেই মূলত এই তারতম্য। শুধু সার্ভার ঠান্ডা করার পানি হিসাব করা হচ্ছে, নাকি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত পানিও এর সঙ্গে যোগ করা হচ্ছে—তার ওপর সংখ্যাটি অনেকটাই নির্ভর করে। তুলনায়, একটি সাধারণ গুগল সার্চে পানির ব্যবহার অনেক কম। বিভিন্ন হিসাবে তা শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৬ মিলিলিটারের মধ্যে ধরা হয়।

একক হিসাবে এসব সংখ্যা খুব সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ যখন এআই দিয়ে ছবি বা লেখা তৈরি করছেন, তখন এই ‘সামান্য’ পানির পরিমাণ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটিই বড় প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক নীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড এনার্জি স্টাডি ইনস্টিটিউটের (ইইএসআই) তথ্য অনুযায়ী, একটি মাঝারি আকারের ডেটা সেন্টার বছরে প্রায় ১১ কোটি গ্যালন পানি খরচ করে। এই পরিমাণ পানি প্রায় এক হাজার পরিবারের সারা বছরের পানির চাহিদার সমান। আর বড় ডেটা সেন্টারগুলোতে দিনে ৫০ লাখ গ্যালন পর্যন্ত পানি প্রয়োজন হতে পারে।

পানির এই ব্যবহার শুধু সার্ভার ঠান্ডা রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ডেটা সেন্টার চালাতে প্রয়োজনীয় বিপুল বিদ্যুতের বড় একটি অংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি বা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখতেও প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ এআই যত বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে, পরোক্ষভাবে পানির খরচও তত বাড়বে।

ভারতের বেঙ্গালুরুতে হিউলেট প্যাকার্ড এন্টারপ্রাইজের (এইচপিই) কার্যালয়ের ভেতরে থাকা একটি ডেটা সেন্টারে হেঁটে যাচ্ছেন এক কর্মী।

এই পানি আসে কোত্থেকে

সাধারণত ডেটা সেন্টারগুলো প্রয়োজনীয় পানি স্থানীয় সরবরাহ লাইন, নদী বা ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে সংগ্রহ করে। এই পানির বড় অংশই সুপেয় বা খাওয়ার উপযোগী মিঠাপানি। ফলে অনেক জায়গায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন ব্যবহার ও কৃষিকাজের জন্য বরাদ্দ পানির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। গ্রীষ্মকালে পরিস্থিতি আরও ভোগান্তিকর হয়ে ওঠে।

সমালোচনার মুখে মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাজনের মতো বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিকল্প পানির উৎসের দিকে ঝুঁকছে।

মাইক্রোসফট তাদের নিজস্ব টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের কুইন্সি, ক্যালিফোর্নিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো এলাকায় তারা পরিশোধিত বর্জ্যপানির ব্যবহার বাড়িয়েছে। বাসাবাড়ি বা কারখানায় ব্যবহৃত দূষিত পানিকে বর্জ্যপানি শোধনাগারে বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করে আবার ব্যবহারের উপযোগী করাকে পরিশোধিত বর্জ্যপানি বলা হয়। এই পানি পানের উপযোগী না হলেও পরিবেশের জন্য নিরাপদ এবং ডেটা সেন্টারের সার্ভার ঠান্ডা রাখার জন্য বেশ কার্যকর। মাইক্রোসফটের দাবি, সিঙ্গাপুরে তাদের ডেটা সেন্টারের প্রায় পুরোটাই, অর্থাৎ ৯৯ শতাংশ, এখন অ-সুপেয় পানি দিয়ে চলে।

অ্যামাজনের প্রযুক্তি শাখা অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) ২০২৫ সালের জুনে জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ১২০টির বেশি ডেটা সেন্টারে পরিশোধিত বর্জ্যপানি ব্যবহার করবে। এতে বছরে প্রায় ৫৩ কোটি গ্যালন সুপেয় পানি সাশ্রয় হবে বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।

অন্যদিকে গুগল ও মাইক্রোসফট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা ‘ওয়াটার পজিটিভ’ হবে। অর্থাৎ তারা যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করবে, তার চেয়ে বেশি পানি পরিবেশে ফিরিয়ে দেবে। অ্যামাজনও একই অঙ্গীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ২০২৫ সালের শেষে তারা সেই লক্ষ্যের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পূরণ করেছে।

সমুদ্রের তলদেশে ডেটা সেন্টারের ধারণা

সুপেয় পানির ওপর চাপ কমাতে এবং সার্ভার ঠান্ডা রাখার খরচ কমাতে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সমুদ্রের দিকে তাকাচ্ছে। সমুদ্রের পানি বিনা মূল্যে পাওয়া যায় এবং এটি প্রাকৃতিকভাবেই ঠান্ডা। তাই সার্ভার ঠান্ডা করার জন্য এটি একটি সম্ভাব্য সমাধান।

এই ধারণা থেকে ২০১৮ সালে স্কটল্যান্ডের অর্কনি দ্বীপপুঞ্জের উপকূলে ‘প্রজেক্ট নেটিক’ নামে একটি পরীক্ষামূলক ডেটা সেন্টার সমুদ্রের তলদেশে স্থাপন করেছিল মাইক্রোসফট। প্রায় দুই বছর পর সেটি তুলে দেখা যায়, ডাঙায় থাকা সমসংখ্যক সার্ভারের তুলনায় পানির নিচে থাকা সার্ভারগুলো আট গুণ কম নষ্ট হয়েছে বলে মাইক্রোসফট নিজেই জানিয়েছিল। তবে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের বিভিন্ন ব্যবহারিক জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত মাইক্রোসফটের প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে আর এগোয়নি। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির ক্লাউড অপারেশনস বিভাগের প্রধান নোয়েল ওয়ালশ সংবাদমাধ্যমকে সরাসরি বলেন, তাঁরা আর বিশ্বের কোথাও পানির নিচে ডেটা সেন্টার তৈরি করছেন না।

তবে মাইক্রোসফট থেমে গেলেও এ পথে বেশ এগিয়েছে চীন। চীনা প্রতিষ্ঠান হাইল্যান্ডার হাইনান দ্বীপের উপকূলে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক পানির নিচের ডেটা সেন্টার চালু করেছে বলে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে। ১ হাজার ৩০০ টন ওজনের এই স্থাপনা সমুদ্রের ৩৫ মিটার গভীরে বসানো হয়েছে। হাইল্যান্ডারের দাবি, পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে ১০০টি মডিউল বসানো গেলে স্থলভাগে একই ক্ষমতার একটি ডেটা সেন্টারের তুলনায় এটি বছরে প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ এবং ১ লাখ ৫ হাজার টন সুপেয় পানি সাশ্রয় করবে।

সুপেয় পানি ছাড়া কীভাবে চলবে

স্থলভাগে যেভাবে পানি বাষ্পীভূত করে সার্ভার ঠান্ডা করা হয়, সাগরের নিচে সেভাবে কাজ হয় না। সেখানে সার্ভারগুলো একটি সম্পূর্ণ বদ্ধ বা সিল করা বাক্সের (মডিউল) ভেতরে থাকে। চারপাশের ঠান্ডা লবণাক্ত সমুদ্রের পানি কেবল বাক্সের বাইরের আবরণ দিয়ে তাপ শুষে নেয়। বিষয়টি অনেকটা গরম চায়ের কাপ বরফঠান্ডা পানির গামলায় ডুবিয়ে রাখার মতো।

সমুদ্রের পানি সরাসরি যন্ত্রপাতির সংস্পর্শে আসে না বলে মরিচা ধরারও ভয় নেই। এই পদ্ধতিতে বাষ্পীভবনের কোনো সুযোগ নেই, শুধু তাপের বিনিময় হয়। আর বিশাল সমুদ্রের সামান্য পরিমাণ পানি এতে যৎসামান্যই গরম হয়, যা পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না একই পানি কি বারবার ব্যবহার করা যায় না

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ডেটা সেন্টারগুলো কেন একই পানি বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বা রিসাইকেল করে ব্যবহার করে না? এর সবচেয়ে বড় কারণ পানির গুণাগুণ। বাষ্পীভবন পদ্ধতিতে পানি যখন বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, তখন পানিতে থাকা সাধারণ খনিজ উপাদান যেমন আয়রন, ক্যালসিয়াম বা লবণ নিচে পড়ে থাকে। ফলে অবশিষ্ট পানিতে খনিজের ঘনত্ব বেড়ে যায়।

এই পানি বারবার ব্যবহার করলে খনিজ উপাদানগুলো ডেটা সেন্টারের পাইপ বা যন্ত্রপাতির গায়ে পুরু আস্তরণ বা ‘স্কেল’ তৈরি করে। মানুষের রক্তনালিতে চর্বি জমলে যেমন রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি হয়, পাইপে এই আস্তরণ জমলেও তেমনি পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং দামি যন্ত্রপাতির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই বাধ্য হয়েই ওই পুরোনো খনিজযুক্ত পানি ফেলে দিয়ে নতুন সুপেয় পানি ঢালতে হয়।

তাহলে এর বিকল্প কী

বিকল্প হিসেবে এখন ‘ক্লোজড-লুপ’ বা বদ্ধ চক্র এবং ‘ইমারশন কুলিং’ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। গাড়ির রেডিয়েটরে যেভাবে ইঞ্জিন ঠান্ডা রাখা হয়, ক্লোজড-লুপ পদ্ধতিটি অনেকটা সে রকম। এতে পানি বা বিশেষ কোনো তরল একটি বদ্ধ পাইপের ভেতর দিয়ে ঘোরে, যা বাইরের বাতাসের সংস্পর্শে আসে না। ফলে তরলটি বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না এবং বারবার ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে ইমারশন কুলিং পদ্ধতিতে পুরো সার্ভারটিকেই বিদ্যুৎ-অপরিবাহী বিশেষ একধরনের রাসায়নিক তরলে ডুবিয়ে রাখা হয়।

এই পদ্ধতিগুলোয় পানির অপচয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে ঠিকই, কিন্তু দেখা দেয় নতুন এক সংকট। পানি যেহেতু বাষ্প হয়ে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পায় না, তাই ওই বদ্ধ গরম তরলকে ঠান্ডা করতে ডেটা সেন্টারগুলোতে বিশাল আকৃতির বৈদ্যুতিক পাখা বা শক্তিশালী এসি (চিলার বা রেফ্রিজারেশন সিস্টেম) চালাতে হয়। এগুলো চালাতে প্রয়োজন হয় প্রচুর বিদ্যুতের। পাশাপাশি পুরো পদ্ধতিটি স্থাপন করাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

প্রযুক্তি-দুনিয়ায় তাই একটি কথা প্রচলিত আছে—বিদ্যুৎ বাঁচাতে গেলে পানি বেশি খরচ হয়, আর পানি বাঁচাতে গেলে বিদ্যুৎ বেশি পোড়ে। এই দুটির মধ্যে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ভারসাম্য তৈরি করাই এখন প্রকৌশলীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তথ্যসূত্র: আইইইই স্পেকট্রাম, এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড এনার্জি স্টাডি ইনস্টিটিউট, মডিউলেজ, অফিশিয়াল মাইক্রোসফট ব্লগ, অ্যামাজন সাসটেইনেবিলিটি, ডেটা সেন্টার ডায়নামিকস ও টমস হার্ডওয়্যার।

Share this news as a Photo Card

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের পাশে নাগরিক উদ্যোগ নিল বিএমইউ

04 October 2026

ডিআইজি-অতিরিক্ত ডিআইজিসহ পুলিশের ২৪ কর্মকর্তাকে বদলি

www.hostbuybd.com

এআই দিয়ে ছবি বানাতে খরচ হচ্ছে বিপুল পানি, বিদ্যুৎ

Update Time : ০৫:১৩:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মুঠোফোনে কয়েকটি শব্দ লিখে দিলেই চোখের পলকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) একটি ছবি তৈরি করে দিচ্ছে। কয়েক দিন ধরে আশির দশকের ছবি তৈরির একটি ট্রেন্ডও দেখা যাচ্ছে। কাজটি এখন এত সহজ হয়ে গেছে যে এর পেছনের জটিলতা নিয়ে খুব একটা ভাবতে হয় না। কিন্তু একটি ‘কমান্ড’ বা নির্দেশ পালন করতে গিয়ে পর্দার আড়ালে খরচ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ পানি ও বিদ্যুৎ।

প্রশ্ন উঠতে পারে, একজন মানুষ ঘরে বসে স্মার্টফোনে এআই ব্যবহার করছেন, অথচ তাঁর তো এক ফোঁটা পানিও খরচ হচ্ছে না। তাহলে এআই কোম্পানিগুলোর এত পানি প্রয়োজন কেন? এমনকি এই পানির ব্যবহার কমাতে সমুদ্রের তলদেশে ডেটা সেন্টার স্থাপনের কথাও ভাবা হচ্ছে। এর পেছনের কারণ কী, তা জানা যাক।

ধরা যাক, আপনি চ্যাটজিপিটি বা মিডজার্নির মতো কোনো এআই টুলে লিখলেন, ‘পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যাস্তের একটি ছবি বানাও।’ আপনার এই নির্দেশ ইন্টারনেটের মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দূরের কোনো ডেটা সেন্টারে পৌঁছে যায়। এসব ডেটা সেন্টার মূলত বিশাল আকারের কম্পিউটার কারখানা। সেখানে হাজার হাজার শক্তিশালী সার্ভার দিনরাত একটানা কাজ করে আপনার ছবিটি তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে আপনার ফোন বা ল্যাপটপের নিজস্ব কোনো ভূমিকা নেই।

সমস্যা হলো, হাজার হাজার সার্ভার একসঙ্গে জটিল হিসাব-নিকাশ করার সময় প্রচণ্ড গরম হয়ে ওঠে। যথাযথভাবে তাপ সরাতে না পারলে দামি যন্ত্রগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এসব উত্তপ্ত সার্ভার ঠান্ডা রাখতেই প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ পানির।

বেশির ভাগ বড় ডেটা সেন্টার সার্ভার ঠান্ডা রাখতে ‘বাষ্পীভবন শীতলীকরণ (ইভাপোরেটিভ কুলিং)’ পদ্ধতি ব্যবহার করে। বিষয়টি অনেকটা আমাদের শরীরের ঘামার মতো। গরমের দিনে শরীরের ঘাম বাতাসে শুকিয়ে গেলে যেমন ঠান্ডা লাগে, ডেটা সেন্টারের পদ্ধতিটিও অনেকটা তেমন। গরম সার্ভার ঠান্ডা করার জন্য সেগুলোর পাশ দিয়ে ঠান্ডা পানি প্রবাহিত করা হয়। সেই পানি সার্ভারের তাপ শুষে নিয়ে গরম হয়ে যায়। এরপর গরম পানিকে কুলিং টাওয়ারের বাতাস ও বিশেষ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পাঠানো হয়। সেখানে পানির কিছু অংশ বাষ্প হয়ে বাতাসে উড়ে যায়। এই বাষ্পীভবনের কারণে বাকি পানিটুকু আবার ঠান্ডা হয়ে যায়। এরপর সেই ঠান্ডা পানি আবার সার্ভারে পাঠানো হয়।

এই পদ্ধতিতে পানি খুব একটা সাশ্রয় হয় না; বরং প্রচুর পানির অপচয় ঘটে। এর প্রধান কারণ দুটি। প্রথমত, গরম পানি ঠান্ডা করার সময় এর একটি বড় অংশ বাষ্প হয়ে বাতাসে উড়ে যায়। ফলে ঘাটতি পূরণ করতে নিয়মিত নতুন পানি সরবরাহ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার পর অবশিষ্ট পানিতে লবণ ও খনিজ পদার্থের ঘনত্ব বেড়ে যায়। এসব খনিজযুক্ত পানি বারবার ব্যবহার করলে সার্ভার ও পাইপে আয়রনের আস্তরণ জমে যন্ত্রপাতির ক্ষতি হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট সময় পর ওই ঘন পানি ফেলে দিয়ে আবার নতুন সুপেয় পানি যোগ করতে হয়।

পানির খরচটা আসলে কত

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রকৌশল সাময়িকী আইইইই স্পেকট্রামে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে করা একটি গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, জিপিটি-৩ মডেল দিয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ শব্দের একটি সাধারণ লেখা তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গড় ডেটা সেন্টারে প্রায় ১৭ মিলিলিটার পানি খরচ হতো। এর মধ্যে সরাসরি কুলিংয়ে লাগে পৌনে ২ মিলিলিটার, আর বাকিটা লাগে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। তবে ছবি তৈরিতে পানির নির্দিষ্ট কোনো হিসাব ওই প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।

ছবি তৈরিতে পানির খরচ নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যায়। জ্বালানি খরচের উপাত্তের ভিত্তিতে করা কিছু হিসাবে একটি ছবি তৈরিতে গড়ে প্রায় ২৩ মিলিলিটার পানি খরচের কথা বলা হয়েছে। আবার অন্য কিছু বিশ্লেষণে এই পরিমাণ ৫ থেকে ৬০ মিলিলিটার, এমনকি তারও বেশি হতে দেখা গেছে। হিসাবের পদ্ধতির পার্থক্যের কারণেই মূলত এই তারতম্য। শুধু সার্ভার ঠান্ডা করার পানি হিসাব করা হচ্ছে, নাকি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত পানিও এর সঙ্গে যোগ করা হচ্ছে—তার ওপর সংখ্যাটি অনেকটাই নির্ভর করে। তুলনায়, একটি সাধারণ গুগল সার্চে পানির ব্যবহার অনেক কম। বিভিন্ন হিসাবে তা শূন্য দশমিক ২ থেকে শূন্য দশমিক ৬ মিলিলিটারের মধ্যে ধরা হয়।

একক হিসাবে এসব সংখ্যা খুব সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ যখন এআই দিয়ে ছবি বা লেখা তৈরি করছেন, তখন এই ‘সামান্য’ পানির পরিমাণ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটিই বড় প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক নীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড এনার্জি স্টাডি ইনস্টিটিউটের (ইইএসআই) তথ্য অনুযায়ী, একটি মাঝারি আকারের ডেটা সেন্টার বছরে প্রায় ১১ কোটি গ্যালন পানি খরচ করে। এই পরিমাণ পানি প্রায় এক হাজার পরিবারের সারা বছরের পানির চাহিদার সমান। আর বড় ডেটা সেন্টারগুলোতে দিনে ৫০ লাখ গ্যালন পর্যন্ত পানি প্রয়োজন হতে পারে।

পানির এই ব্যবহার শুধু সার্ভার ঠান্ডা রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ডেটা সেন্টার চালাতে প্রয়োজনীয় বিপুল বিদ্যুতের বড় একটি অংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি বা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখতেও প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ এআই যত বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে, পরোক্ষভাবে পানির খরচও তত বাড়বে।

ভারতের বেঙ্গালুরুতে হিউলেট প্যাকার্ড এন্টারপ্রাইজের (এইচপিই) কার্যালয়ের ভেতরে থাকা একটি ডেটা সেন্টারে হেঁটে যাচ্ছেন এক কর্মী।

এই পানি আসে কোত্থেকে

সাধারণত ডেটা সেন্টারগুলো প্রয়োজনীয় পানি স্থানীয় সরবরাহ লাইন, নদী বা ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে সংগ্রহ করে। এই পানির বড় অংশই সুপেয় বা খাওয়ার উপযোগী মিঠাপানি। ফলে অনেক জায়গায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন ব্যবহার ও কৃষিকাজের জন্য বরাদ্দ পানির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। গ্রীষ্মকালে পরিস্থিতি আরও ভোগান্তিকর হয়ে ওঠে।

সমালোচনার মুখে মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাজনের মতো বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিকল্প পানির উৎসের দিকে ঝুঁকছে।

মাইক্রোসফট তাদের নিজস্ব টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের কুইন্সি, ক্যালিফোর্নিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো এলাকায় তারা পরিশোধিত বর্জ্যপানির ব্যবহার বাড়িয়েছে। বাসাবাড়ি বা কারখানায় ব্যবহৃত দূষিত পানিকে বর্জ্যপানি শোধনাগারে বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করে আবার ব্যবহারের উপযোগী করাকে পরিশোধিত বর্জ্যপানি বলা হয়। এই পানি পানের উপযোগী না হলেও পরিবেশের জন্য নিরাপদ এবং ডেটা সেন্টারের সার্ভার ঠান্ডা রাখার জন্য বেশ কার্যকর। মাইক্রোসফটের দাবি, সিঙ্গাপুরে তাদের ডেটা সেন্টারের প্রায় পুরোটাই, অর্থাৎ ৯৯ শতাংশ, এখন অ-সুপেয় পানি দিয়ে চলে।

অ্যামাজনের প্রযুক্তি শাখা অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) ২০২৫ সালের জুনে জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ১২০টির বেশি ডেটা সেন্টারে পরিশোধিত বর্জ্যপানি ব্যবহার করবে। এতে বছরে প্রায় ৫৩ কোটি গ্যালন সুপেয় পানি সাশ্রয় হবে বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।

অন্যদিকে গুগল ও মাইক্রোসফট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা ‘ওয়াটার পজিটিভ’ হবে। অর্থাৎ তারা যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করবে, তার চেয়ে বেশি পানি পরিবেশে ফিরিয়ে দেবে। অ্যামাজনও একই অঙ্গীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ২০২৫ সালের শেষে তারা সেই লক্ষ্যের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পূরণ করেছে।

সমুদ্রের তলদেশে ডেটা সেন্টারের ধারণা

সুপেয় পানির ওপর চাপ কমাতে এবং সার্ভার ঠান্ডা রাখার খরচ কমাতে এআই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সমুদ্রের দিকে তাকাচ্ছে। সমুদ্রের পানি বিনা মূল্যে পাওয়া যায় এবং এটি প্রাকৃতিকভাবেই ঠান্ডা। তাই সার্ভার ঠান্ডা করার জন্য এটি একটি সম্ভাব্য সমাধান।

এই ধারণা থেকে ২০১৮ সালে স্কটল্যান্ডের অর্কনি দ্বীপপুঞ্জের উপকূলে ‘প্রজেক্ট নেটিক’ নামে একটি পরীক্ষামূলক ডেটা সেন্টার সমুদ্রের তলদেশে স্থাপন করেছিল মাইক্রোসফট। প্রায় দুই বছর পর সেটি তুলে দেখা যায়, ডাঙায় থাকা সমসংখ্যক সার্ভারের তুলনায় পানির নিচে থাকা সার্ভারগুলো আট গুণ কম নষ্ট হয়েছে বলে মাইক্রোসফট নিজেই জানিয়েছিল। তবে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের বিভিন্ন ব্যবহারিক জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত মাইক্রোসফটের প্রকল্পটি বাণিজ্যিকভাবে আর এগোয়নি। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির ক্লাউড অপারেশনস বিভাগের প্রধান নোয়েল ওয়ালশ সংবাদমাধ্যমকে সরাসরি বলেন, তাঁরা আর বিশ্বের কোথাও পানির নিচে ডেটা সেন্টার তৈরি করছেন না।

তবে মাইক্রোসফট থেমে গেলেও এ পথে বেশ এগিয়েছে চীন। চীনা প্রতিষ্ঠান হাইল্যান্ডার হাইনান দ্বীপের উপকূলে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক পানির নিচের ডেটা সেন্টার চালু করেছে বলে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে। ১ হাজার ৩০০ টন ওজনের এই স্থাপনা সমুদ্রের ৩৫ মিটার গভীরে বসানো হয়েছে। হাইল্যান্ডারের দাবি, পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে ১০০টি মডিউল বসানো গেলে স্থলভাগে একই ক্ষমতার একটি ডেটা সেন্টারের তুলনায় এটি বছরে প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ এবং ১ লাখ ৫ হাজার টন সুপেয় পানি সাশ্রয় করবে।

সুপেয় পানি ছাড়া কীভাবে চলবে

স্থলভাগে যেভাবে পানি বাষ্পীভূত করে সার্ভার ঠান্ডা করা হয়, সাগরের নিচে সেভাবে কাজ হয় না। সেখানে সার্ভারগুলো একটি সম্পূর্ণ বদ্ধ বা সিল করা বাক্সের (মডিউল) ভেতরে থাকে। চারপাশের ঠান্ডা লবণাক্ত সমুদ্রের পানি কেবল বাক্সের বাইরের আবরণ দিয়ে তাপ শুষে নেয়। বিষয়টি অনেকটা গরম চায়ের কাপ বরফঠান্ডা পানির গামলায় ডুবিয়ে রাখার মতো।

সমুদ্রের পানি সরাসরি যন্ত্রপাতির সংস্পর্শে আসে না বলে মরিচা ধরারও ভয় নেই। এই পদ্ধতিতে বাষ্পীভবনের কোনো সুযোগ নেই, শুধু তাপের বিনিময় হয়। আর বিশাল সমুদ্রের সামান্য পরিমাণ পানি এতে যৎসামান্যই গরম হয়, যা পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না একই পানি কি বারবার ব্যবহার করা যায় না

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ডেটা সেন্টারগুলো কেন একই পানি বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বা রিসাইকেল করে ব্যবহার করে না? এর সবচেয়ে বড় কারণ পানির গুণাগুণ। বাষ্পীভবন পদ্ধতিতে পানি যখন বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, তখন পানিতে থাকা সাধারণ খনিজ উপাদান যেমন আয়রন, ক্যালসিয়াম বা লবণ নিচে পড়ে থাকে। ফলে অবশিষ্ট পানিতে খনিজের ঘনত্ব বেড়ে যায়।

এই পানি বারবার ব্যবহার করলে খনিজ উপাদানগুলো ডেটা সেন্টারের পাইপ বা যন্ত্রপাতির গায়ে পুরু আস্তরণ বা ‘স্কেল’ তৈরি করে। মানুষের রক্তনালিতে চর্বি জমলে যেমন রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি হয়, পাইপে এই আস্তরণ জমলেও তেমনি পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং দামি যন্ত্রপাতির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই বাধ্য হয়েই ওই পুরোনো খনিজযুক্ত পানি ফেলে দিয়ে নতুন সুপেয় পানি ঢালতে হয়।

তাহলে এর বিকল্প কী

বিকল্প হিসেবে এখন ‘ক্লোজড-লুপ’ বা বদ্ধ চক্র এবং ‘ইমারশন কুলিং’ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। গাড়ির রেডিয়েটরে যেভাবে ইঞ্জিন ঠান্ডা রাখা হয়, ক্লোজড-লুপ পদ্ধতিটি অনেকটা সে রকম। এতে পানি বা বিশেষ কোনো তরল একটি বদ্ধ পাইপের ভেতর দিয়ে ঘোরে, যা বাইরের বাতাসের সংস্পর্শে আসে না। ফলে তরলটি বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না এবং বারবার ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে ইমারশন কুলিং পদ্ধতিতে পুরো সার্ভারটিকেই বিদ্যুৎ-অপরিবাহী বিশেষ একধরনের রাসায়নিক তরলে ডুবিয়ে রাখা হয়।

এই পদ্ধতিগুলোয় পানির অপচয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে ঠিকই, কিন্তু দেখা দেয় নতুন এক সংকট। পানি যেহেতু বাষ্প হয়ে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পায় না, তাই ওই বদ্ধ গরম তরলকে ঠান্ডা করতে ডেটা সেন্টারগুলোতে বিশাল আকৃতির বৈদ্যুতিক পাখা বা শক্তিশালী এসি (চিলার বা রেফ্রিজারেশন সিস্টেম) চালাতে হয়। এগুলো চালাতে প্রয়োজন হয় প্রচুর বিদ্যুতের। পাশাপাশি পুরো পদ্ধতিটি স্থাপন করাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

প্রযুক্তি-দুনিয়ায় তাই একটি কথা প্রচলিত আছে—বিদ্যুৎ বাঁচাতে গেলে পানি বেশি খরচ হয়, আর পানি বাঁচাতে গেলে বিদ্যুৎ বেশি পোড়ে। এই দুটির মধ্যে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ভারসাম্য তৈরি করাই এখন প্রকৌশলীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তথ্যসূত্র: আইইইই স্পেকট্রাম, এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড এনার্জি স্টাডি ইনস্টিটিউট, মডিউলেজ, অফিশিয়াল মাইক্রোসফট ব্লগ, অ্যামাজন সাসটেইনেবিলিটি, ডেটা সেন্টার ডায়নামিকস ও টমস হার্ডওয়্যার।

Share this news as a Photo Card