Dhaka ০৮:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনাম
বিয়ে নিয়ে কেয়া পায়েলের ভাবনা, জীবনসঙ্গী হিসেবে চান বিশ্বাস ও সম্মান জনকল্যাণমূলক কাজে সরকারকে সহযোগিতা করবে জামায়াত: গোলাম পরওয়ার মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের পাশে নাগরিক উদ্যোগ নিল বিএমইউ বুয়েটের ডিগ্রি, ছেড়েছেন লোভনীয় চাকরি—প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষক নায়লা শারাফ ২৬ অক্টোবর জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্গাপূজার ছুটি বাড়ল এক দিন, ২০–২৪ অক্টোবর টানা ছুটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে ২০২৬ সালের নোবেল পেলেন ডেইসেরথ, হেগেম্যান ও নাগেল বিসিআইসির চেয়ারম্যান হলেন অতিরিক্ত সচিব মো. বাবুল মিঞা শিক্ষকতা ‘উপায়হীন বিকল্প’ নয়, মেধাবীদের প্রথম পছন্দ করতে হবে: তারেক রহমান ধানমন্ডিতে যাত্রা শুরু করল আকিজ ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার

বুয়েটের ডিগ্রি, ছেড়েছেন লোভনীয় চাকরি—প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষক নায়লা শারাফ

উচ্চ বেতনের চাকরি, সামাজিক আভিজাত্য আর ক্ষমতার মোহ—এসবকেই সাধারণত আমাদের সমাজে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। তবে প্রচলিত এই ধারণাকে উপেক্ষা করে জীবনের ভিন্ন পথ বেছে নেন কিছু মানুষ। তাঁদের কাছে অর্থ বা খ্যাতির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে নীতি, আত্মতৃপ্তি আর শিশুদের নিষ্পাপ ভালোবাসা। এমনই এক ব্যতিক্রমী ও অনুপ্রেরণাদায়ী শিক্ষক নায়লা শারাফ। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন।

বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করার পরপরই এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি পান নায়লা শারাফ। তবে কাজের পরিবেশ ও অনিয়মের সঙ্গে আপস করতে না পেরে অল্পদিনের মধ্যেই চাকরিটি ছেড়ে দেন। পরে জনতা ব্যাংকে ‘এক্সিকিউটিভ অফিসার’ হিসেবে যোগ দিলেও সেখানকার যান্ত্রিক জীবন তাঁকে টানেনি। এমনকি ৩৪তম বিসিএসে কোয়ালিফাইড হওয়ার পরও সরকারি চাকরিতে যোগ দেননি তিনি। বর্তমানে নেত্রকোনা সদরের পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করছেন নায়লা।

কেন একের পর এক লোভনীয় চাকরি ছেড়ে দিলেন—জানতে চাইলে ঢাকা পোস্টকে নায়লা শারাফ বলেন, ‘আমার অর্থের প্রতি কোনো লোভ নেই, খ্যাতির জন্যও কোনো মোহ নেই। আমি খুব অল্পতেই খুশি হয়ে যাই। একটা চকলেট কিংবা কেউ ভালোবেসে একটা ফুল দিলেই আমার মন ভরে যায়। আমার এত অর্থ বা এত বড় পদের প্রয়োজন নেই। আমি সাধারণ জীবন পছন্দ করি এবং দিনশেষে একটা নিশ্চিন্তের, পরিতৃপ্তির ঘুম চাই।’

সব লোভনীয় সুযোগ থেকে সরে এসে শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নিয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুদের পড়ানোর দায়িত্ব।

নৈতিকতা ও সাহসের শিক্ষা

স্কুলে শুধু বইয়ের পড়ার মধ্যেই নায়লা শারাফের শিক্ষা সীমাবদ্ধ নয়। তিনি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন শেখান কীভাবে সত্যবাদী ও সাহসী মানুষ হতে হয়। অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার শিক্ষাও তিনি শিশুদের মনে গেঁথে দেন।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া তাঁর বিশেষ বার্তা সম্পর্কে নায়লা বলেন, ‘আমি আমার শিক্ষার্থীদের বলি, খুন করলেও যেন এতটুকু স্পিরিট থাকে যে সবার সামনে বলতে পারো, “আমি খুন করে আসছি।” যে কথাটা সবার সামনে বুক ফুলিয়ে বলতে পারো না, সেই কাজ কখনো করবে না। তুমি ঠিক কাজ করেছ না ভুল করেছ, তা অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করতে হবে না; নিজেকে জিজ্ঞেস করবে। যদি উত্তর আসে, “হ্যাঁ, আমি এটা সবার সামনে বলতে পারব”, তবেই জানবে তোমার কাজটা সঠিক।’

প্রধান শিক্ষকের চোখে নায়লা শারাফ

বিদ্যালয়ে নায়লা শারাফের অসাধারণ নিষ্ঠা, আলাদা শিখনপদ্ধতি ও দায়িত্ববোধে মুগ্ধ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লীলা রানী ভৌমিক।

নায়লা শারাফ সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘নায়লা ম্যাডাম আমাদের বিদ্যালয়ের এক অমূল্য সম্পদ। বুয়েটের মতো জায়গায় পড়েও যেভাবে তিনি একদম প্রান্তিক পর্যায়ের শিশুদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসে পড়াচ্ছেন, তা সত্যিই বিরল। তিনি কখনো ঘড়ির কাঁটা দেখে স্কুলে আসেন না বা যান না। ক্লাসের পড়া সহজ করতে নিজে হাতে ছবি আঁকা থেকে শুরু করে ডিজিটাল কনটেন্ট বানানোর কাজ স্কুলেই করেন। শিশুদের নৈতিকতা ও সততা শেখাতে তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়। তাঁর মতো আদর্শবান শিক্ষক প্রতিটি স্কুলেই প্রয়োজন।’

ভিকারুন্নিসার শিক্ষা প্রান্তিক শিশুদের মাঝে

গত সাত বছর ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন নায়লা শারাফ। নিজে ভিকারুন্নিসা নূন স্কুলের ছাত্রী ছিলেন তিনি। নায়লা চান, প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া পরিবারের সন্তানরাও যেন শহরের স্বনামধন্য স্কুলের শিক্ষার্থীদের মতো গুণগত শিক্ষা পায়। এ জন্য পাঠ্যপুস্তকের পড়া সহজ করতে তিনি নিজেই কনটেন্ট তৈরি করেন, ছবি আঁকেন এবং বাড়তি সময় দিয়ে স্কুলে বসেই সব প্রস্তুতি নেন।

নিজের কাজের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে নায়লা বলেন, ‘অন্য কোনো বিভাগে জব করলে হয়ত অনেক টাকার মালিক হতাম, সবাই বলত, “ওহ, কত মেধাবী!”—এটুকুই। কিন্তু এখানে আমি ভালোবাসা পাই। আমি এই ভালোবাসার খুব কাঙাল। আমার কাছে যখন ছোট ছোট বাচ্চারা এসে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায়, তখন মনে হয় এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছুই হতে পারে না। এই ভালোবাসার জন্যই আমি প্রাইমারিতে আটকে গেছি।’

ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি

বুয়েটের ডিগ্রি নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়াকে আমাদের সমাজ সহজে মেনে নিতে পারে না। এমনকি নিকটাত্মীয় ও পরিচিতদের কাছ থেকেও তাঁকে নানা কথা শুনতে হয়েছে। তবে এসবকে একেবারেই পাত্তা দেন না নায়লা।

সমাজ ও স্বজনদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি মুচকি হেসে বলেন, ‘আমাকেও অনেকে পাগল বলে, আমার আত্মীয়-স্বজনরাও বলে। তারা যা খুশি বলুক, কিন্তু আমি জানি আমি পাগল নই। আমি ভিকারুন্নিসায় পড়ে যে সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি, এই প্রান্তিক শিশুদেরও ঠিক ততটাই যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে চাই। আমার মৃত্যু হলে এই বাচ্চারা যেন আমার জন্য একটু প্রার্থনা করে, এটাই আমার চাওয়া।’

নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান

উন্নত বিশ্বে প্রাথমিক শিক্ষা ও শিক্ষকদের সবচেয়ে বেশি সম্মান দেওয়া হলেও আমাদের দেশে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। তবে তরুণ ও মেধাবীরা এগিয়ে এলে এই পরিস্থিতি দ্রুতই বদলাবে বলে মনে করেন নায়লা।

তিনি বলেন, ‘আপনি যদি প্রতিদানের আশা ত্যাগ করে শুধু দেওয়ার জন্য আসতে পারেন, তবেই প্রাথমিক শিক্ষায় আপনাকে স্বাগতম। আমরা যদি সত্যি সত্যি দক্ষ ও নিষ্ঠাবান হই, তবে সরকারও বাধ্য হবে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে। বিশ্বজুড়ে প্রাথমিক শিক্ষকতা সবচেয়ে সম্মানজনক পেশা। আমাদের দেশেও এমনটা হবে, যদি আমার চেয়েও বেশি মেধাবী ও ডেডিকেটেড তরুণেরা এই পেশায় এগিয়ে আসে।’

নিজের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা অঢেল অর্থের মোহ ত্যাগ করে নায়লা শারাফ নিজেকে সঁপে দিয়েছেন শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে। অনটন কিংবা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিশুদের নিষ্পাপ ভালোবাসা এবং তাঁদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার এই লড়াইটিই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে নায়লা শারাফের মতো নিঃস্বার্থ, নীতিবান ও আদর্শিক শিক্ষকদের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

Share this news as a Photo Card

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

বিয়ে নিয়ে কেয়া পায়েলের ভাবনা, জীবনসঙ্গী হিসেবে চান বিশ্বাস ও সম্মান

04 October 2026

ধানমন্ডিতে যাত্রা শুরু করল আকিজ ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার

www.hostbuybd.com

বুয়েটের ডিগ্রি, ছেড়েছেন লোভনীয় চাকরি—প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষক নায়লা শারাফ

Update Time : ০৫:৩৭:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

উচ্চ বেতনের চাকরি, সামাজিক আভিজাত্য আর ক্ষমতার মোহ—এসবকেই সাধারণত আমাদের সমাজে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। তবে প্রচলিত এই ধারণাকে উপেক্ষা করে জীবনের ভিন্ন পথ বেছে নেন কিছু মানুষ। তাঁদের কাছে অর্থ বা খ্যাতির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে নীতি, আত্মতৃপ্তি আর শিশুদের নিষ্পাপ ভালোবাসা। এমনই এক ব্যতিক্রমী ও অনুপ্রেরণাদায়ী শিক্ষক নায়লা শারাফ। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন।

বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করার পরপরই এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি পান নায়লা শারাফ। তবে কাজের পরিবেশ ও অনিয়মের সঙ্গে আপস করতে না পেরে অল্পদিনের মধ্যেই চাকরিটি ছেড়ে দেন। পরে জনতা ব্যাংকে ‘এক্সিকিউটিভ অফিসার’ হিসেবে যোগ দিলেও সেখানকার যান্ত্রিক জীবন তাঁকে টানেনি। এমনকি ৩৪তম বিসিএসে কোয়ালিফাইড হওয়ার পরও সরকারি চাকরিতে যোগ দেননি তিনি। বর্তমানে নেত্রকোনা সদরের পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করছেন নায়লা।

কেন একের পর এক লোভনীয় চাকরি ছেড়ে দিলেন—জানতে চাইলে ঢাকা পোস্টকে নায়লা শারাফ বলেন, ‘আমার অর্থের প্রতি কোনো লোভ নেই, খ্যাতির জন্যও কোনো মোহ নেই। আমি খুব অল্পতেই খুশি হয়ে যাই। একটা চকলেট কিংবা কেউ ভালোবেসে একটা ফুল দিলেই আমার মন ভরে যায়। আমার এত অর্থ বা এত বড় পদের প্রয়োজন নেই। আমি সাধারণ জীবন পছন্দ করি এবং দিনশেষে একটা নিশ্চিন্তের, পরিতৃপ্তির ঘুম চাই।’

সব লোভনীয় সুযোগ থেকে সরে এসে শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নিয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশুদের পড়ানোর দায়িত্ব।

নৈতিকতা ও সাহসের শিক্ষা

স্কুলে শুধু বইয়ের পড়ার মধ্যেই নায়লা শারাফের শিক্ষা সীমাবদ্ধ নয়। তিনি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন শেখান কীভাবে সত্যবাদী ও সাহসী মানুষ হতে হয়। অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার শিক্ষাও তিনি শিশুদের মনে গেঁথে দেন।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া তাঁর বিশেষ বার্তা সম্পর্কে নায়লা বলেন, ‘আমি আমার শিক্ষার্থীদের বলি, খুন করলেও যেন এতটুকু স্পিরিট থাকে যে সবার সামনে বলতে পারো, “আমি খুন করে আসছি।” যে কথাটা সবার সামনে বুক ফুলিয়ে বলতে পারো না, সেই কাজ কখনো করবে না। তুমি ঠিক কাজ করেছ না ভুল করেছ, তা অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করতে হবে না; নিজেকে জিজ্ঞেস করবে। যদি উত্তর আসে, “হ্যাঁ, আমি এটা সবার সামনে বলতে পারব”, তবেই জানবে তোমার কাজটা সঠিক।’

প্রধান শিক্ষকের চোখে নায়লা শারাফ

বিদ্যালয়ে নায়লা শারাফের অসাধারণ নিষ্ঠা, আলাদা শিখনপদ্ধতি ও দায়িত্ববোধে মুগ্ধ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লীলা রানী ভৌমিক।

নায়লা শারাফ সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘নায়লা ম্যাডাম আমাদের বিদ্যালয়ের এক অমূল্য সম্পদ। বুয়েটের মতো জায়গায় পড়েও যেভাবে তিনি একদম প্রান্তিক পর্যায়ের শিশুদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসে পড়াচ্ছেন, তা সত্যিই বিরল। তিনি কখনো ঘড়ির কাঁটা দেখে স্কুলে আসেন না বা যান না। ক্লাসের পড়া সহজ করতে নিজে হাতে ছবি আঁকা থেকে শুরু করে ডিজিটাল কনটেন্ট বানানোর কাজ স্কুলেই করেন। শিশুদের নৈতিকতা ও সততা শেখাতে তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়। তাঁর মতো আদর্শবান শিক্ষক প্রতিটি স্কুলেই প্রয়োজন।’

ভিকারুন্নিসার শিক্ষা প্রান্তিক শিশুদের মাঝে

গত সাত বছর ধরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন নায়লা শারাফ। নিজে ভিকারুন্নিসা নূন স্কুলের ছাত্রী ছিলেন তিনি। নায়লা চান, প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া পরিবারের সন্তানরাও যেন শহরের স্বনামধন্য স্কুলের শিক্ষার্থীদের মতো গুণগত শিক্ষা পায়। এ জন্য পাঠ্যপুস্তকের পড়া সহজ করতে তিনি নিজেই কনটেন্ট তৈরি করেন, ছবি আঁকেন এবং বাড়তি সময় দিয়ে স্কুলে বসেই সব প্রস্তুতি নেন।

নিজের কাজের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে নায়লা বলেন, ‘অন্য কোনো বিভাগে জব করলে হয়ত অনেক টাকার মালিক হতাম, সবাই বলত, “ওহ, কত মেধাবী!”—এটুকুই। কিন্তু এখানে আমি ভালোবাসা পাই। আমি এই ভালোবাসার খুব কাঙাল। আমার কাছে যখন ছোট ছোট বাচ্চারা এসে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায়, তখন মনে হয় এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছুই হতে পারে না। এই ভালোবাসার জন্যই আমি প্রাইমারিতে আটকে গেছি।’

ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি

বুয়েটের ডিগ্রি নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়াকে আমাদের সমাজ সহজে মেনে নিতে পারে না। এমনকি নিকটাত্মীয় ও পরিচিতদের কাছ থেকেও তাঁকে নানা কথা শুনতে হয়েছে। তবে এসবকে একেবারেই পাত্তা দেন না নায়লা।

সমাজ ও স্বজনদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি মুচকি হেসে বলেন, ‘আমাকেও অনেকে পাগল বলে, আমার আত্মীয়-স্বজনরাও বলে। তারা যা খুশি বলুক, কিন্তু আমি জানি আমি পাগল নই। আমি ভিকারুন্নিসায় পড়ে যে সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি, এই প্রান্তিক শিশুদেরও ঠিক ততটাই যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে চাই। আমার মৃত্যু হলে এই বাচ্চারা যেন আমার জন্য একটু প্রার্থনা করে, এটাই আমার চাওয়া।’

নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান

উন্নত বিশ্বে প্রাথমিক শিক্ষা ও শিক্ষকদের সবচেয়ে বেশি সম্মান দেওয়া হলেও আমাদের দেশে চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। তবে তরুণ ও মেধাবীরা এগিয়ে এলে এই পরিস্থিতি দ্রুতই বদলাবে বলে মনে করেন নায়লা।

তিনি বলেন, ‘আপনি যদি প্রতিদানের আশা ত্যাগ করে শুধু দেওয়ার জন্য আসতে পারেন, তবেই প্রাথমিক শিক্ষায় আপনাকে স্বাগতম। আমরা যদি সত্যি সত্যি দক্ষ ও নিষ্ঠাবান হই, তবে সরকারও বাধ্য হবে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে। বিশ্বজুড়ে প্রাথমিক শিক্ষকতা সবচেয়ে সম্মানজনক পেশা। আমাদের দেশেও এমনটা হবে, যদি আমার চেয়েও বেশি মেধাবী ও ডেডিকেটেড তরুণেরা এই পেশায় এগিয়ে আসে।’

নিজের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা অঢেল অর্থের মোহ ত্যাগ করে নায়লা শারাফ নিজেকে সঁপে দিয়েছেন শত শত শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে। অনটন কিংবা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিশুদের নিষ্পাপ ভালোবাসা এবং তাঁদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার এই লড়াইটিই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে নায়লা শারাফের মতো নিঃস্বার্থ, নীতিবান ও আদর্শিক শিক্ষকদের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

Share this news as a Photo Card