নেত্রকোণার মদন উপজেলার হাওরবেষ্টিত অনগ্রসর জনপদের অধিকাংশ মানুষের জীবন একসময় ধান চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে উদ্যোক্তা মোহাম্মদ এখলাছ মিয়ার হাত ধরে সেই জনপদের তিয়শ্রী ইউনিয়নের কুঠুরীকোণা গ্রাম এখন দেশের অন্যতম শীর্ষ হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের হাবে পরিণত হয়েছে।
কুঠুরীকোণা গ্রামের উদ্যোক্তা মোহাম্মদ এখলাছ মিয়াসহ স্থানীয় খামারিরা দেশীয় ‘তুষ ও হারিকেন পদ্ধতিতে’ হাঁসের ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়ে গ্রামের অর্থনীতিতে পরিবর্তন এনেছেন। গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িই এখন একেকটি স্বাবলম্বী হাঁসের খামারে রূপ নিয়েছে।
হাওরপাড়ের এই ঐতিহ্যবাহী গ্রামে হ্যাচারি বিপ্লবের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ ও সফল উদ্যোক্তা ‘হযরত শাহ সুলতান হ্যাচারি’র স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ এখলাছ মিয়া। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কিংবা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই নিজস্ব মেধা, শ্রম ও উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে ১৮ বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করছেন তিনি।
২০০৭-০৮ সালের দিকে ১০ শতাংশ জায়গায় মাত্র ১ হাজার ডিম দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু করেন এখলাছ মিয়া। হারিকেনের তাপ ও তুষ/লেপ ব্যবহার করে কৃত্রিম উপায়ে ডিম ফোটানোর প্রক্রিয়া শুরুতে শতভাগ সফল হয়নি। প্রথম চালানে ৫০০ ডিম নষ্ট হলেও দমে যাননি তিনি। পরের মাসেই ১ হাজার ডিম থেকে ৭০০টি বাচ্চা ফোটাতে সক্ষম হন এখলাছ মিয়া।
বর্তমানে পাঁচ কাঠা জমিতে বিস্তৃত তাঁর হ্যাচারিতে ১০ থেকে ১২ জন দক্ষ কারিগরের স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়েছে। কর্মদক্ষতা অনুযায়ী তাঁদের প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ২২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩২ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন দেওয়া হয়।
এখলাছ মিয়ার হ্যাচারিতে মূলত খাকি ক্যাম্পবেল, জিনডিং, বেইজিং ও ইন্ডিয়ান রানার জাতের হাঁস উৎপাদন করা হয়। এক দিন থেকে শুরু করে পাঁচ মাস বয়সী হাঁসের বাচ্চা ও পূর্ণাঙ্গ হাঁস প্রতিদিন পিকআপ ও মোটরসাইকেলে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। এখলাছ মিয়া একাই বছরে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি পিস হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন ও বাজারজাত করে কুঠুরীকোণা গ্রামের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছেন।
উদ্যোক্তা এখলাছ মিয়ার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর পথ ধরে কুঠুরীকোণা গ্রামের অন্য বেকার যুবকেরাও এ শিল্পে যুক্ত হয়েছেন। সমবয়সী অনেকে যখন মোবাইল ফোনে সময় কাটান, তখন এখলাছ মিয়ার হ্যাচারিসহ স্থানীয় বিভিন্ন খামারে কাজ করে কারিগর আমির হামজাসহ অনেক যুবক প্রতি মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করে নিজেদের ভাগ্য বদলেছেন।
গ্রামের ‘তানজুম হাঁসের খামার এন্ড হ্যাচারি’র স্বত্বাধিকারী হোসাইন কবীর বাসসকে বলেন, কুঠুরীকোণা গ্রামে বর্তমানে ১৪৯ জন খামারি রয়েছেন। তাঁদের একটি সমন্বিত সমবায় সমিতিও রয়েছে। পুরো গ্রামজুড়ে এখন বছরে কোটি কোটি টাকার বিপুল বাণিজ্য ও লেনদেন হচ্ছে, যা পুরো এলাকার বেকারত্ব দূরীকরণে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে জানা গেছে, ১৯৭৫ সালের দিকে হাদিস উল্লাহ সর্বপ্রথম তুষ ও হারিকেন পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চা ফোটানোর প্রাথমিক উদ্যোগ নেন। পরে ৯০-এর দশকে তাঁর ছোট ভাই মো. ইয়াসিন মিয়া এ পদ্ধতি সম্প্রসারণে কাজ শুরু করেন। তবে সেই পারিবারিক ধারণাকে বাণিজ্যিক ও ব্যাপক শিল্পে রূপ দেওয়ার মূল কৃতিত্ব মোহাম্মদ এখলাছ মিয়ার। তাঁর ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় আজ কুঠুরীকোণা গ্রাম সারা দেশে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের একটি অনন্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
উদ্যোক্তা এখলাছ মিয়া বাসসকে বলেন, দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে বিশাল এই কার্যক্রম পরিচালনা করলেও সরকারি কোনো অনুদান বা সরাসরি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা তাঁরা পাননি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রয়োজনীয় ব্যাংক ঋণের সুবিধা পেলে কুঠুরীকোণা গ্রামের এই প্রযুক্তিভিত্তিক বাচ্চা উৎপাদন শিল্পকে দেশের প্রান্তিক অর্থনীতিতে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
এদিকে, কুঠুরীকোণা গ্রামের এই উদ্ভাবনী শিল্পকে মদন উপজেলার অন্যতম অর্থনৈতিক ফিচার হিসেবে উল্লেখ করে সার্বিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
মদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হেসেন শামীম বাসসকে বলেন, ‘মদন একটি হাওরবেষ্টিত ও গ্যাজেটেড হাওর উপজেলা। এখানকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই হাঁস পালন ও খাবারের উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় কুঠুরীকোণা গ্রামের খামারিরা নিজস্ব উদ্যোগে হাঁস পালন ও বাচ্চা উৎপাদন শুরু করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন।’
তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে। খামারিদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করার কাজও চলছে।
যেকোনো সীমাবদ্ধতা দূর করতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুল আলমকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে খামারিদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।
একই সঙ্গে কুঠুরীকোণা গ্রামের খামারিদের কারিগরি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি হাঁস শিল্পের স্থায়ী প্রসারে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
নেত্রকোণা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বাসসকে বলেন, ‘কুঠুরীকোণা গ্রামের ১৩৮ জন খামারিকে আমরা প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এ ছাড়া এক দিনের বাচ্চাগুলো সংরক্ষণে একটি ‘রেয়ারিং ইউনিট’ স্থাপনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে এবং পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন ও বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলের হাঁস শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে আরও সুদূরপ্রসারী অবদান রাখবে।’
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















