Dhaka ০৮:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনাম
বিয়ে নিয়ে কেয়া পায়েলের ভাবনা, জীবনসঙ্গী হিসেবে চান বিশ্বাস ও সম্মান জনকল্যাণমূলক কাজে সরকারকে সহযোগিতা করবে জামায়াত: গোলাম পরওয়ার মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের পাশে নাগরিক উদ্যোগ নিল বিএমইউ বুয়েটের ডিগ্রি, ছেড়েছেন লোভনীয় চাকরি—প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষক নায়লা শারাফ ২৬ অক্টোবর জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্গাপূজার ছুটি বাড়ল এক দিন, ২০–২৪ অক্টোবর টানা ছুটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে ২০২৬ সালের নোবেল পেলেন ডেইসেরথ, হেগেম্যান ও নাগেল বিসিআইসির চেয়ারম্যান হলেন অতিরিক্ত সচিব মো. বাবুল মিঞা শিক্ষকতা ‘উপায়হীন বিকল্প’ নয়, মেধাবীদের প্রথম পছন্দ করতে হবে: তারেক রহমান ধানমন্ডিতে যাত্রা শুরু করল আকিজ ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার

চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন

চীনের অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার এনে দেশটিকে ‘বিশ্বের কারখানা’ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন। বুধবার দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।

মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, তুলনামূলক কম ধৈর্যের অধিকারী ও ক্ষুরধার বাকপটু এই সংস্কারক ১৯৯০-এর দশকে চীনের রাষ্ট্রীয় শিল্প খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। একই সঙ্গে চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেন তিনি। এর ফলে দেশটির অর্থনৈতিক অগ্রগতি আরও ত্বরান্বিত হয়।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টার দিকে বেইজিংয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ঝু রংজি। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।

বিশ্বের অন্যান্য কমিউনিস্ট শাসিত দেশের সংস্কারের প্রশংসা করায় একসময় তাঁকে শারীরিক শ্রমের জন্য প্রত্যন্ত গ্রামে পাঠানো হয়েছিল। পরে ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন তিনি।

রাষ্ট্রীয় শিল্পে বড় সংস্কার

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষ ও লাভজনক করার উদ্যোগ নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির রক্ষণশীল অংশ এবং রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন ঝু। তাঁর নেওয়া সংস্কারের ফলে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারালেও দীর্ঘ মেয়াদে চীনের অর্থনীতিতে এর বড় প্রভাব পড়ে।

২০১০ সালে জাপানকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের পর চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়। এ ক্ষেত্রে ঝুর নেওয়া সংস্কারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চীনের সাবেক নেতা দেং জিয়াওপিংয়ের ১৯৭৯ সালের সংস্কারকে আরও এগিয়ে নেওয়া এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের সদস্যপদ নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনে ঝুর বিচক্ষণতা ও দৃঢ়তাকে মূল ভূমিকা হিসেবে দেখা হয়। এসব পদক্ষেপ চীনকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে সহায়তা করে।

এসব সংস্কারের ফলে ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে চীনের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের বেশি ছিল। ২০০৭ সালে তা সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছায়।

‘বস’ ও ‘পাগলা ঝু’ নামে পরিচিতি

১৯৯৮ সালে ৬৯ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হন ঝু রংজি। কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা ও দুর্নীতির সমালোচনা এবং সরকারের ব্যর্থতার দায় নিজে নেওয়ার কারণে তিনি চীনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান।

তাঁর কঠোর ও চাহিদাপূর্ণ কাজের ধরন তাঁকে ‘বস’ এবং ‘ঝু ফেংজি’ বা ‘পাগলা ঝু’ নামে পরিচিত করে তোলে।

চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র পিপলস ডেইলি জানিয়েছে, ১৯৯৮ সালে ঝু বলেছিলেন, ‘আমি এখানে ১০০টি কফিন প্রস্তুত রেখেছি; ৯৯টি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য এবং একটি আমার নিজের জন্য।’

দলের শীর্ষ পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিন এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যান লি পেংয়ের পর তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন ঝু। তবে নিজস্ব কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক বলয় না থাকায় তাঁকে টেকনোক্র্যাট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ কারণে অনেক কর্মকর্তা তাঁর নির্দেশ উপেক্ষা করতেন বলে তিনি প্রায়ই ক্ষোভ প্রকাশ করতেন।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সাফল্য

১৯৯০-এর দশকে উপপ্রধানমন্ত্রী থাকাকালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন ঝু। তিনি মূল্য নিয়ন্ত্রণ বিধি কার্যকর করেন এবং লোকসানি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঋণ দেওয়া বন্ধ করেন। এ সময় স্থানীয় নেতাদের বিরোধিতাও উপেক্ষা করেন তিনি।

পরবর্তীতে অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি নিয়ে রক্ষণশীলদের সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও একই কৌশল অনুসরণ করেন ঝু।

১৯৮০-এর দশকে শুরু হওয়া দীর্ঘ আলোচনার পর ডব্লিউটিওর সদস্যপদ নিশ্চিত করার চীনা প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেন তিনি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের অন্তর্ভুক্তি মুক্ত বাণিজ্যকে দেশটির জাতীয় অঙ্গীকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। একই সঙ্গে স্থানীয় কর্মকর্তাদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেওয়া বন্ধে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

১৯৯৯ সালে ডব্লিউটিওতে চীনের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়ার আশায় বাজার উন্মুক্ত করার বেশ কিছু প্রস্তাব নিয়ে ওয়াশিংটনে যান ঝু। তাঁর প্রস্তাবকে নাজুক আখ্যা দিয়ে ক্লিনটন প্রশাসন তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। একই সময়ে দেশের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাঁর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার অভিযোগ তোলে।

তবে সেই সংকট কাটিয়ে ওঠেন ঝু। শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালের ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ডব্লিউটিওতে যোগ দেয় চীন।

ব্যক্তিগত আবাসন খাতের বিস্তার

১৯৯৮ সালে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ফ্ল্যাট বিক্রির একটি উদ্যোগের মাধ্যমে চীনে ব্যক্তিগত আবাসন খাতের বিস্তার ঘটান ঝু। পরিবারগুলো দ্রুত এসব ফ্ল্যাট কিনতে শুরু করে। এক দশকের মধ্যে শহরাঞ্চলের অধিকাংশ আবাসন ব্যক্তিমালিকানায় চলে যায়।

তবে ঝু মুক্ত উদ্যোগের প্রবল সমর্থক ছিলেন না। বরং পার্টির নির্দেশ বাস্তবায়ন করে রাষ্ট্রীয় শিল্পকে পুনর্গঠন করা দক্ষ আমলা হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন তিনি।

অর্থনীতিকে পুরোপুরি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া বা ব্যাপক বেসরকারীকরণের বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল না। ১৯৯০-এর দশকে ব্যাংক, বিমান সংস্থা, তেল কোম্পানি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে সরকারি মালিকানায় রেখেই মুনাফামুখী করপোরেশনে রূপান্তরের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।

সংস্কারের প্রশংসা করে শাস্তি

১৯২৮ সালের ২৩ অক্টোবর মাও সেতুংয়ের নিজ প্রদেশ হুনানে জন্মগ্রহণ করেন ঝু রংজি। কর্মজীবনের শুরুতেই ঝুঁকি নেওয়া ও স্পষ্ট কথা বলার কারণে তাঁকে মূল্য দিতে হয়েছিল।

অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও ১৯৫৭ সালে হাঙ্গেরি ও যুগোস্লাভিয়ার সংস্কারের প্রশংসা করায় তাঁকে ‘ডানপন্থী’ তকমা দেওয়া হয়। এতে ২২ বছর তাঁর ক্যারিয়ার স্থবির হয়ে পড়ে।

১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সালের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় শারীরিক শ্রমের জন্য তাঁকে একটি গ্রামে নির্বাসিত করা হয়।

১৯৭৯ সালে পুনর্বাসিত হওয়ার পর দ্রুত পদোন্নতি পান ঝু। ১৯৮৭ সালে সাংহাইয়ের ডেপুটি পার্টি সেক্রেটারি এবং পরের বছর মেয়র হন তিনি।

১৯৮৯ সালে সাংহাইয়ের মেয়র থাকাকালে বিক্ষোভকারীদের দমন না করা এবং সামরিক বাহিনী না ডাকার অঙ্গীকার করে পরিমিতিবোধ ও সহনশীলতার পরিচয় দেন ঝু।

১৯৯১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য প্রু-ডেমোক্রেসি প্রটেস্টস ইন চায়না: রিপোর্টস ফ্রম দ্য প্রভিন্সেস’ বইয়ে অস্ট্রেলীয় কূটনীতিক শেলি ওয়ার্নার লিখেছেন, সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হলে যে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারত, ঝু অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সঙ্গে তা নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ঝুর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জিয়াং জেমিনকে পরে দেং জিয়াওপিং বেইজিংয়ে ডেকে নিয়ে পার্টির প্রধানের দায়িত্ব দেন। এরপর ১৯৯১ সালে উপপ্রধানমন্ত্রী হন ঝু এবং ১৯৯৩ সালে পার্টির শাসন পরিচালনাকারী স্থায়ী কমিটিতে যোগ দেন।

ভুল স্বীকার করতেন প্রকাশ্যে

সরকারি ভুল স্বীকার এবং এর দায় নেওয়ার মাধ্যমে নেতাদের ‘ভুল না করার’ প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিলেন ঝু।

১৯৯৮ সালের গ্রীষ্মকালীন বন্যায় ৪ হাজার ১৫০ জনের মৃত্যু হয়। এ সময় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। ক্ষুব্ধ হয়ে ঝু বলেছিলেন, কিছু বাঁধ ‘সিমের বীজের গুড়ার’ চেয়েও দুর্বল।

এর তিন বছর পর দক্ষিণ চীনের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিস্ফোরণে অন্তত ৪২ জন নিহত হন। এ ঘটনায় মন্ত্রিসভা জনগণকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় জাতীয় টেলিভিশনে ক্ষমা চান তিনি।

ঝু প্রকাশ্যে কৌতুক করতেন এবং মাঝে মাঝে নিজেকেও নিয়ে রসিকতা করতেন। এতে কমিউনিস্ট পার্টির একঘেয়ে ভাবমূর্তির কিছুটা পরিবর্তন আসে।

১৯৯৯ সালের এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের একটি ছবি দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন, ছবিতে তাঁকে মৃত মানুষের মতো লাগছে। এতে পুরো সভাকক্ষে হাসির রোল পড়ে যায়।

করব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন

উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঝুর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের একটি ছিল নতুন ধরনের করব্যবস্থা তৈরি করা। এর মাধ্যমে স্থানীয় কর্মকর্তাদের সংগৃহীত রাজস্বের বড় অংশ বেইজিংয়ের কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা দিতে বাধ্য করা হয়।

১৯৯৬ সালে ঝু বলেছিলেন, এই কাজের জন্য তাঁর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত।

প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর চীনের অর্থনীতির এই রূপকারকে জনসম্মুখে আর খুব বেশি দেখা যায়নি।

সূত্র: এপি, এনসিবিসি নিউজ।

Share this news as a Photo Card

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

বিয়ে নিয়ে কেয়া পায়েলের ভাবনা, জীবনসঙ্গী হিসেবে চান বিশ্বাস ও সম্মান

04 October 2026

ধানমন্ডিতে যাত্রা শুরু করল আকিজ ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার

www.hostbuybd.com

চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন

Update Time : ০৬:৪৪:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

চীনের অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার এনে দেশটিকে ‘বিশ্বের কারখানা’ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন। বুধবার দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।

মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, তুলনামূলক কম ধৈর্যের অধিকারী ও ক্ষুরধার বাকপটু এই সংস্কারক ১৯৯০-এর দশকে চীনের রাষ্ট্রীয় শিল্প খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। একই সঙ্গে চীনকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেন তিনি। এর ফলে দেশটির অর্থনৈতিক অগ্রগতি আরও ত্বরান্বিত হয়।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টার দিকে বেইজিংয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ঝু রংজি। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর।

বিশ্বের অন্যান্য কমিউনিস্ট শাসিত দেশের সংস্কারের প্রশংসা করায় একসময় তাঁকে শারীরিক শ্রমের জন্য প্রত্যন্ত গ্রামে পাঠানো হয়েছিল। পরে ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন তিনি।

রাষ্ট্রীয় শিল্পে বড় সংস্কার

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষ ও লাভজনক করার উদ্যোগ নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির রক্ষণশীল অংশ এবং রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন ঝু। তাঁর নেওয়া সংস্কারের ফলে লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারালেও দীর্ঘ মেয়াদে চীনের অর্থনীতিতে এর বড় প্রভাব পড়ে।

২০১০ সালে জাপানকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের পর চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়। এ ক্ষেত্রে ঝুর নেওয়া সংস্কারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চীনের সাবেক নেতা দেং জিয়াওপিংয়ের ১৯৭৯ সালের সংস্কারকে আরও এগিয়ে নেওয়া এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের সদস্যপদ নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনে ঝুর বিচক্ষণতা ও দৃঢ়তাকে মূল ভূমিকা হিসেবে দেখা হয়। এসব পদক্ষেপ চীনকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে সহায়তা করে।

এসব সংস্কারের ফলে ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে চীনের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের বেশি ছিল। ২০০৭ সালে তা সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছায়।

‘বস’ ও ‘পাগলা ঝু’ নামে পরিচিতি

১৯৯৮ সালে ৬৯ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হন ঝু রংজি। কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা ও দুর্নীতির সমালোচনা এবং সরকারের ব্যর্থতার দায় নিজে নেওয়ার কারণে তিনি চীনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান।

তাঁর কঠোর ও চাহিদাপূর্ণ কাজের ধরন তাঁকে ‘বস’ এবং ‘ঝু ফেংজি’ বা ‘পাগলা ঝু’ নামে পরিচিত করে তোলে।

চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র পিপলস ডেইলি জানিয়েছে, ১৯৯৮ সালে ঝু বলেছিলেন, ‘আমি এখানে ১০০টি কফিন প্রস্তুত রেখেছি; ৯৯টি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য এবং একটি আমার নিজের জন্য।’

দলের শীর্ষ পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিন এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যান লি পেংয়ের পর তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন ঝু। তবে নিজস্ব কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক বলয় না থাকায় তাঁকে টেকনোক্র্যাট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ কারণে অনেক কর্মকর্তা তাঁর নির্দেশ উপেক্ষা করতেন বলে তিনি প্রায়ই ক্ষোভ প্রকাশ করতেন।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সাফল্য

১৯৯০-এর দশকে উপপ্রধানমন্ত্রী থাকাকালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন ঝু। তিনি মূল্য নিয়ন্ত্রণ বিধি কার্যকর করেন এবং লোকসানি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঋণ দেওয়া বন্ধ করেন। এ সময় স্থানীয় নেতাদের বিরোধিতাও উপেক্ষা করেন তিনি।

পরবর্তীতে অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি নিয়ে রক্ষণশীলদের সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও একই কৌশল অনুসরণ করেন ঝু।

১৯৮০-এর দশকে শুরু হওয়া দীর্ঘ আলোচনার পর ডব্লিউটিওর সদস্যপদ নিশ্চিত করার চীনা প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেন তিনি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের অন্তর্ভুক্তি মুক্ত বাণিজ্যকে দেশটির জাতীয় অঙ্গীকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। একই সঙ্গে স্থানীয় কর্মকর্তাদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেওয়া বন্ধে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

১৯৯৯ সালে ডব্লিউটিওতে চীনের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়ার আশায় বাজার উন্মুক্ত করার বেশ কিছু প্রস্তাব নিয়ে ওয়াশিংটনে যান ঝু। তাঁর প্রস্তাবকে নাজুক আখ্যা দিয়ে ক্লিনটন প্রশাসন তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। একই সময়ে দেশের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাঁর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার অভিযোগ তোলে।

তবে সেই সংকট কাটিয়ে ওঠেন ঝু। শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালের ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ডব্লিউটিওতে যোগ দেয় চীন।

ব্যক্তিগত আবাসন খাতের বিস্তার

১৯৯৮ সালে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ফ্ল্যাট বিক্রির একটি উদ্যোগের মাধ্যমে চীনে ব্যক্তিগত আবাসন খাতের বিস্তার ঘটান ঝু। পরিবারগুলো দ্রুত এসব ফ্ল্যাট কিনতে শুরু করে। এক দশকের মধ্যে শহরাঞ্চলের অধিকাংশ আবাসন ব্যক্তিমালিকানায় চলে যায়।

তবে ঝু মুক্ত উদ্যোগের প্রবল সমর্থক ছিলেন না। বরং পার্টির নির্দেশ বাস্তবায়ন করে রাষ্ট্রীয় শিল্পকে পুনর্গঠন করা দক্ষ আমলা হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন তিনি।

অর্থনীতিকে পুরোপুরি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া বা ব্যাপক বেসরকারীকরণের বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল না। ১৯৯০-এর দশকে ব্যাংক, বিমান সংস্থা, তেল কোম্পানি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে সরকারি মালিকানায় রেখেই মুনাফামুখী করপোরেশনে রূপান্তরের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।

সংস্কারের প্রশংসা করে শাস্তি

১৯২৮ সালের ২৩ অক্টোবর মাও সেতুংয়ের নিজ প্রদেশ হুনানে জন্মগ্রহণ করেন ঝু রংজি। কর্মজীবনের শুরুতেই ঝুঁকি নেওয়া ও স্পষ্ট কথা বলার কারণে তাঁকে মূল্য দিতে হয়েছিল।

অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও ১৯৫৭ সালে হাঙ্গেরি ও যুগোস্লাভিয়ার সংস্কারের প্রশংসা করায় তাঁকে ‘ডানপন্থী’ তকমা দেওয়া হয়। এতে ২২ বছর তাঁর ক্যারিয়ার স্থবির হয়ে পড়ে।

১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সালের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় শারীরিক শ্রমের জন্য তাঁকে একটি গ্রামে নির্বাসিত করা হয়।

১৯৭৯ সালে পুনর্বাসিত হওয়ার পর দ্রুত পদোন্নতি পান ঝু। ১৯৮৭ সালে সাংহাইয়ের ডেপুটি পার্টি সেক্রেটারি এবং পরের বছর মেয়র হন তিনি।

১৯৮৯ সালে সাংহাইয়ের মেয়র থাকাকালে বিক্ষোভকারীদের দমন না করা এবং সামরিক বাহিনী না ডাকার অঙ্গীকার করে পরিমিতিবোধ ও সহনশীলতার পরিচয় দেন ঝু।

১৯৯১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য প্রু-ডেমোক্রেসি প্রটেস্টস ইন চায়না: রিপোর্টস ফ্রম দ্য প্রভিন্সেস’ বইয়ে অস্ট্রেলীয় কূটনীতিক শেলি ওয়ার্নার লিখেছেন, সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হলে যে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারত, ঝু অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সঙ্গে তা নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

ঝুর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জিয়াং জেমিনকে পরে দেং জিয়াওপিং বেইজিংয়ে ডেকে নিয়ে পার্টির প্রধানের দায়িত্ব দেন। এরপর ১৯৯১ সালে উপপ্রধানমন্ত্রী হন ঝু এবং ১৯৯৩ সালে পার্টির শাসন পরিচালনাকারী স্থায়ী কমিটিতে যোগ দেন।

ভুল স্বীকার করতেন প্রকাশ্যে

সরকারি ভুল স্বীকার এবং এর দায় নেওয়ার মাধ্যমে নেতাদের ‘ভুল না করার’ প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিলেন ঝু।

১৯৯৮ সালের গ্রীষ্মকালীন বন্যায় ৪ হাজার ১৫০ জনের মৃত্যু হয়। এ সময় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। ক্ষুব্ধ হয়ে ঝু বলেছিলেন, কিছু বাঁধ ‘সিমের বীজের গুড়ার’ চেয়েও দুর্বল।

এর তিন বছর পর দক্ষিণ চীনের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিস্ফোরণে অন্তত ৪২ জন নিহত হন। এ ঘটনায় মন্ত্রিসভা জনগণকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় জাতীয় টেলিভিশনে ক্ষমা চান তিনি।

ঝু প্রকাশ্যে কৌতুক করতেন এবং মাঝে মাঝে নিজেকেও নিয়ে রসিকতা করতেন। এতে কমিউনিস্ট পার্টির একঘেয়ে ভাবমূর্তির কিছুটা পরিবর্তন আসে।

১৯৯৯ সালের এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের একটি ছবি দেখিয়ে তিনি বলেছিলেন, ছবিতে তাঁকে মৃত মানুষের মতো লাগছে। এতে পুরো সভাকক্ষে হাসির রোল পড়ে যায়।

করব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন

উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঝুর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের একটি ছিল নতুন ধরনের করব্যবস্থা তৈরি করা। এর মাধ্যমে স্থানীয় কর্মকর্তাদের সংগৃহীত রাজস্বের বড় অংশ বেইজিংয়ের কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা দিতে বাধ্য করা হয়।

১৯৯৬ সালে ঝু বলেছিলেন, এই কাজের জন্য তাঁর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত।

প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর চীনের অর্থনীতির এই রূপকারকে জনসম্মুখে আর খুব বেশি দেখা যায়নি।

সূত্র: এপি, এনসিবিসি নিউজ।

Share this news as a Photo Card