Dhaka ০৮:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনাম
বিয়ে নিয়ে কেয়া পায়েলের ভাবনা, জীবনসঙ্গী হিসেবে চান বিশ্বাস ও সম্মান জনকল্যাণমূলক কাজে সরকারকে সহযোগিতা করবে জামায়াত: গোলাম পরওয়ার মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের পাশে নাগরিক উদ্যোগ নিল বিএমইউ বুয়েটের ডিগ্রি, ছেড়েছেন লোভনীয় চাকরি—প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষক নায়লা শারাফ ২৬ অক্টোবর জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্গাপূজার ছুটি বাড়ল এক দিন, ২০–২৪ অক্টোবর টানা ছুটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে ২০২৬ সালের নোবেল পেলেন ডেইসেরথ, হেগেম্যান ও নাগেল বিসিআইসির চেয়ারম্যান হলেন অতিরিক্ত সচিব মো. বাবুল মিঞা শিক্ষকতা ‘উপায়হীন বিকল্প’ নয়, মেধাবীদের প্রথম পছন্দ করতে হবে: তারেক রহমান ধানমন্ডিতে যাত্রা শুরু করল আকিজ ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার

পাঁচ দশকের স্বাস্থ্যকেন্দ্র বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ৬ জন কারাগারে

মিরপুর-১-এর ডি ব্লকে ১০ কাঠা জমির ওপর ১৯৭৬ সাল থেকে দরিদ্র, অসহায় নারী ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)ও এখানে পরিচালিত হয়।

জায়গাটি সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনাপত্তিপত্রের শর্তে ১৯৮৪ সালে রাড্ডাকে সেখানে টিকা ও স্বাস্থ্যসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর গত পাঁচ দশক ধরে জমিটি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে রাড্ডা।

স্থায়ীভাবে জমিটি পাওয়ার জন্য রাড্ডার পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হয়েছিল। সেটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

২০০৫ সাল থেকে বরাদ্দের সূত্রে জমিটির মালিকানা দাবি করে আসছে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় মালিক সমিতি’। গত ২৯ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর কাছে জমিটি নিয়ে একটি আবেদন করে সমমনা দোকানদার সমবায় মালিক সমিতি। আবেদনে সমিতির তৎকালীন সভানেত্রী ও বর্তমান সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি নেত্রী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির স্বাক্ষর রয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাড্ডার জায়গাটি দখলের চেষ্টা দীর্ঘদিনের। ২০০৯ ও ২০১৯ সালে অন্তত তিনটি পৃথক গ্রুপ জায়গাটি দখলের চেষ্টা করে। স্থানীয়দের বাধা ও নিজেদের মধ্যে বিরোধের কারণে তারা কেউ সফল হয়নি।

২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হওয়ার পর কাজী টিপু সুলতান জমিটি তাঁদের পারিবারিক সম্পত্তি বলে দাবি করে দখলের চেষ্টা করেছিলেন। তবে জমিটি সরকারি খাস জমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত থাকায় তিনি দখলে নিতে পারেননি।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর টিপু সুলতান ও তাঁর অনুসারীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর জমিটি দখলে নিতে বিএনপির দুটি পক্ষ সক্রিয় হয়। এর একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেত্রী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। অন্য পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা জগলুর পাশা পাপেল, যিনি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা আক্তার তুলির অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

এই দুই পক্ষই ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’র ব্যানারে এক হয়ে জমিটি দখলের চেষ্টা করছে।

এদিকে জমিটির মালিকানা নিয়ে আদালতে পাল্টাপাল্টি মামলা ও একটি রিটও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বলেন, জায়গাটি গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের। তাঁরা সেখানে ১৯৭৬ সাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। ১৯৮৪ সালে রাড্ডার সঙ্গে সরকারের একটি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, যত দিন রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা দেবে, তত দিন সেখানে কার্যক্রম চালাতে পারবে।

ডা. নাসরিন আখতার বলেন, এরপর থেকে এক দিনের জন্যও সেবাকেন্দ্রটি বন্ধ হয়নি। এখান থেকেই সরকারের ইপিআই টিকা কার্যক্রমের ৬০ শতাংশ কাভারেজ, পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রসূতি নারীদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হতো। এ কারণে গরিব মানুষের কাছে এটি ‘গরিবের হাসপাতাল’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এর আগেও এটি দখলের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তারা সফল হতে পারেনি। এ নিয়ে এখনো একটি মামলা চলমান রয়েছে।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা চালানোর আগে সমমনা দোকানদার সমিতি কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কেউ কখনো যোগাযোগ করেনি।’

স্থানীয় বাসিন্দা ও মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের ব্যবসায়ী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, এই সেবাকেন্দ্র থেকে এলাকার ধনী-গরিব সবাই প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। কেউ যদি জমি পেয়েই থাকেন, তাহলে আইনি প্রক্রিয়ায় এসে প্রশাসনের সহযোগিতায় তাঁরা জমি বুঝে নেবেন। কিন্তু রাতের আঁধারে এভাবে একটি সেবাপ্রতিষ্ঠান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বুঝতে হবে তাঁদের কাগজপত্রে দুর্বলতা রয়েছে। তাঁরা ছোটবেলা থেকেই জেনে আসছেন, এটি সরকারি জায়গা। যখন যে সরকার থাকে, তখন তাদের দলের লোকেরা এ জায়গা দখলে নিতে চান।

সেবাকেন্দ্রটি থেকে কত টাকার মালামাল লুট হয়েছে জানতে চাইলে নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বলেন, আনুমানিক দেড় কোটি টাকার মতো হবে। একজন প্রসূতি মায়ের প্রয়োজনীয় সব সেবা এখান থেকে দেওয়া হতো।

তিনি বলেন, এখানে ইপিআই টিকা, টিকা প্রদানের সরকারি রেজিস্টার ও নথি, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণ, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, একটি জেনারেটর, দুটি কম্পিউটার, প্রিন্টার, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), তিনটি স্টিলের আলমারি, সিসিটিভি ক্যামেরা, চেয়ার-টেবিল ও অন্যান্য আসবাব লুট করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে শিশুদের টিকা দেওয়ার সব ডকুমেন্ট নিয়ে যাওয়ায়। এসব ডকুমেন্টের ভিত্তিতে এই সেন্টারে আসা শিশুদের টিকা দেওয়ার জন্য ফোন করা হতো। এখন এটি করা না গেলে অনেক শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হবে।

হামলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও মোস্তফা জগলুর পাশা পাপেলের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন ধরেননি।

এদিকে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ধ্বংসস্তূপ পরিদর্শন করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। এ সময় তিনি বলেন, এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন। একটি সুন্দর সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে রাতের অন্ধকারে বুলডোজার এনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ধরে গুঁড়িয়ে দেওয়া কখনোই কাম্য নয়। তাঁরা এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেন না।

তিনি বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ প্রশাসন ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শাহ আলী থানার ওসিকে ক্লোজ করা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে তদন্ত চলছে। প্রায় ৫০ বছর ধরে এলাকার অসহায় ও দরিদ্র মানুষদের সেবা দিয়ে আসা এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কোনোভাবেই ব্যাহত হতে দেওয়া হবে না।

জায়গাটির মালিকানা নিয়ে আমিনুল হক বলেন, এটি গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের জায়গা এবং এ বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। কারও কোনো আইনি দাবি থাকলে তাঁরা আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা উত্থাপন করতে পারেন। রাতের আঁধারে বুলডোজার দিয়ে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভেঙে ফেলার অধিকার কারও নেই।

হামলার সময় পুলিশের নীরব ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

রাত সাড়ে ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত সেবাকেন্দ্রটিতে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। এই দীর্ঘ সময়েও পুলিশ এসে হামলাকারীদের নিবৃত্ত করেনি। ফলে এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রাড্ডার প্রশাসক ও কোষাধ্যক্ষ মো. আহসান হাবিব বলেন, সেবাকেন্দ্রটিতে যখন ভাঙচুর চালানো হয়, তখন তাঁদের দুজন নিরাপত্তাকর্মী অনিন্দ্র সরকার ও আব্দুল হাইকে মারধর করে বেঁধে রাখা হয়। তাঁদের উদ্ধারের জন্য প্রথমে ওসিকে ফোন করেন তিনি। পরে সশরীরে গিয়ে অনুরোধ করেন। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পুলিশ শুধু বলেছে, ‘ওদের কিছু হবে না।’

জামাল নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, এখান থেকে থানার দূরত্ব এক কিলোমিটারেরও কম। টানা চার ঘণ্টা ধরে এখানে হামলা ও মালামাল লুটপাট হলেও পুলিশের কোনো তৎপরতা ছিল না। বিষয়টি তাঁদের কাছে যথেষ্ট সন্দেহজনক মনে হয়েছে।

এদিকে এ ঘটনায় পুলিশের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার। তিনি জানান, রোববারই এ-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, পুলিশের গাফিলতির বিষয়টি সামনে আসায় শাহ আলী থানার ওসিকে দায়িত্বে অবহেলার কারণে ক্লোজ করা হয়েছে। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গ্রেপ্তারের পর ৬ আসামি কারাগারে

এ ঘটনায় শাহ আলী থানার মামলায় গ্রেপ্তার করা ছয় আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। আসামিরা হলেন—মো. শাহাদাত হোসেন (৩৩), কাজী মকবুল হোসেন (৫৮), মো. শাহআলম (৫৩), মো. আতিকুর রহমান (৩৩), মো. কামরুল ইসলাম (৫২) ও মো. শাকিল (২০)।

Share this news as a Photo Card

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

বিয়ে নিয়ে কেয়া পায়েলের ভাবনা, জীবনসঙ্গী হিসেবে চান বিশ্বাস ও সম্মান

04 October 2026

ধানমন্ডিতে যাত্রা শুরু করল আকিজ ইনসাফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার

www.hostbuybd.com

পাঁচ দশকের স্বাস্থ্যকেন্দ্র বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ৬ জন কারাগারে

Update Time : ০৬:১৯:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মিরপুর-১-এর ডি ব্লকে ১০ কাঠা জমির ওপর ১৯৭৬ সাল থেকে দরিদ্র, অসহায় নারী ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)ও এখানে পরিচালিত হয়।

জায়গাটি সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনাপত্তিপত্রের শর্তে ১৯৮৪ সালে রাড্ডাকে সেখানে টিকা ও স্বাস্থ্যসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর গত পাঁচ দশক ধরে জমিটি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে রাড্ডা।

স্থায়ীভাবে জমিটি পাওয়ার জন্য রাড্ডার পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হয়েছিল। সেটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

২০০৫ সাল থেকে বরাদ্দের সূত্রে জমিটির মালিকানা দাবি করে আসছে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় মালিক সমিতি’। গত ২৯ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর কাছে জমিটি নিয়ে একটি আবেদন করে সমমনা দোকানদার সমবায় মালিক সমিতি। আবেদনে সমিতির তৎকালীন সভানেত্রী ও বর্তমান সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি নেত্রী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির স্বাক্ষর রয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাড্ডার জায়গাটি দখলের চেষ্টা দীর্ঘদিনের। ২০০৯ ও ২০১৯ সালে অন্তত তিনটি পৃথক গ্রুপ জায়গাটি দখলের চেষ্টা করে। স্থানীয়দের বাধা ও নিজেদের মধ্যে বিরোধের কারণে তারা কেউ সফল হয়নি।

২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হওয়ার পর কাজী টিপু সুলতান জমিটি তাঁদের পারিবারিক সম্পত্তি বলে দাবি করে দখলের চেষ্টা করেছিলেন। তবে জমিটি সরকারি খাস জমি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত থাকায় তিনি দখলে নিতে পারেননি।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর টিপু সুলতান ও তাঁর অনুসারীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর জমিটি দখলে নিতে বিএনপির দুটি পক্ষ সক্রিয় হয়। এর একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেত্রী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। অন্য পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা জগলুর পাশা পাপেল, যিনি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা আক্তার তুলির অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

এই দুই পক্ষই ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’র ব্যানারে এক হয়ে জমিটি দখলের চেষ্টা করছে।

এদিকে জমিটির মালিকানা নিয়ে আদালতে পাল্টাপাল্টি মামলা ও একটি রিটও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বলেন, জায়গাটি গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের। তাঁরা সেখানে ১৯৭৬ সাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। ১৯৮৪ সালে রাড্ডার সঙ্গে সরকারের একটি চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, যত দিন রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা দেবে, তত দিন সেখানে কার্যক্রম চালাতে পারবে।

ডা. নাসরিন আখতার বলেন, এরপর থেকে এক দিনের জন্যও সেবাকেন্দ্রটি বন্ধ হয়নি। এখান থেকেই সরকারের ইপিআই টিকা কার্যক্রমের ৬০ শতাংশ কাভারেজ, পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রসূতি নারীদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হতো। এ কারণে গরিব মানুষের কাছে এটি ‘গরিবের হাসপাতাল’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এর আগেও এটি দখলের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তারা সফল হতে পারেনি। এ নিয়ে এখনো একটি মামলা চলমান রয়েছে।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা চালানোর আগে সমমনা দোকানদার সমিতি কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কেউ কখনো যোগাযোগ করেনি।’

স্থানীয় বাসিন্দা ও মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের ব্যবসায়ী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, এই সেবাকেন্দ্র থেকে এলাকার ধনী-গরিব সবাই প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। কেউ যদি জমি পেয়েই থাকেন, তাহলে আইনি প্রক্রিয়ায় এসে প্রশাসনের সহযোগিতায় তাঁরা জমি বুঝে নেবেন। কিন্তু রাতের আঁধারে এভাবে একটি সেবাপ্রতিষ্ঠান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বুঝতে হবে তাঁদের কাগজপত্রে দুর্বলতা রয়েছে। তাঁরা ছোটবেলা থেকেই জেনে আসছেন, এটি সরকারি জায়গা। যখন যে সরকার থাকে, তখন তাদের দলের লোকেরা এ জায়গা দখলে নিতে চান।

সেবাকেন্দ্রটি থেকে কত টাকার মালামাল লুট হয়েছে জানতে চাইলে নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বলেন, আনুমানিক দেড় কোটি টাকার মতো হবে। একজন প্রসূতি মায়ের প্রয়োজনীয় সব সেবা এখান থেকে দেওয়া হতো।

তিনি বলেন, এখানে ইপিআই টিকা, টিকা প্রদানের সরকারি রেজিস্টার ও নথি, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণ, ওষুধ ও ভ্যাকসিন, দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, একটি জেনারেটর, দুটি কম্পিউটার, প্রিন্টার, তিনটি ফ্রিজ, তিনটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি), তিনটি স্টিলের আলমারি, সিসিটিভি ক্যামেরা, চেয়ার-টেবিল ও অন্যান্য আসবাব লুট করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে শিশুদের টিকা দেওয়ার সব ডকুমেন্ট নিয়ে যাওয়ায়। এসব ডকুমেন্টের ভিত্তিতে এই সেন্টারে আসা শিশুদের টিকা দেওয়ার জন্য ফোন করা হতো। এখন এটি করা না গেলে অনেক শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হবে।

হামলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও মোস্তফা জগলুর পাশা পাপেলের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন ধরেননি।

এদিকে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ধ্বংসস্তূপ পরিদর্শন করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। এ সময় তিনি বলেন, এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন। একটি সুন্দর সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে রাতের অন্ধকারে বুলডোজার এনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ধরে গুঁড়িয়ে দেওয়া কখনোই কাম্য নয়। তাঁরা এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেন না।

তিনি বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ প্রশাসন ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শাহ আলী থানার ওসিকে ক্লোজ করা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে তদন্ত চলছে। প্রায় ৫০ বছর ধরে এলাকার অসহায় ও দরিদ্র মানুষদের সেবা দিয়ে আসা এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কোনোভাবেই ব্যাহত হতে দেওয়া হবে না।

জায়গাটির মালিকানা নিয়ে আমিনুল হক বলেন, এটি গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের জায়গা এবং এ বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। কারও কোনো আইনি দাবি থাকলে তাঁরা আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা উত্থাপন করতে পারেন। রাতের আঁধারে বুলডোজার দিয়ে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভেঙে ফেলার অধিকার কারও নেই।

হামলার সময় পুলিশের নীরব ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

রাত সাড়ে ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত সেবাকেন্দ্রটিতে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। এই দীর্ঘ সময়েও পুলিশ এসে হামলাকারীদের নিবৃত্ত করেনি। ফলে এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রাড্ডার প্রশাসক ও কোষাধ্যক্ষ মো. আহসান হাবিব বলেন, সেবাকেন্দ্রটিতে যখন ভাঙচুর চালানো হয়, তখন তাঁদের দুজন নিরাপত্তাকর্মী অনিন্দ্র সরকার ও আব্দুল হাইকে মারধর করে বেঁধে রাখা হয়। তাঁদের উদ্ধারের জন্য প্রথমে ওসিকে ফোন করেন তিনি। পরে সশরীরে গিয়ে অনুরোধ করেন। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পুলিশ শুধু বলেছে, ‘ওদের কিছু হবে না।’

জামাল নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, এখান থেকে থানার দূরত্ব এক কিলোমিটারেরও কম। টানা চার ঘণ্টা ধরে এখানে হামলা ও মালামাল লুটপাট হলেও পুলিশের কোনো তৎপরতা ছিল না। বিষয়টি তাঁদের কাছে যথেষ্ট সন্দেহজনক মনে হয়েছে।

এদিকে এ ঘটনায় পুলিশের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার। তিনি জানান, রোববারই এ-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, পুলিশের গাফিলতির বিষয়টি সামনে আসায় শাহ আলী থানার ওসিকে দায়িত্বে অবহেলার কারণে ক্লোজ করা হয়েছে। এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গ্রেপ্তারের পর ৬ আসামি কারাগারে

এ ঘটনায় শাহ আলী থানার মামলায় গ্রেপ্তার করা ছয় আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। আসামিরা হলেন—মো. শাহাদাত হোসেন (৩৩), কাজী মকবুল হোসেন (৫৮), মো. শাহআলম (৫৩), মো. আতিকুর রহমান (৩৩), মো. কামরুল ইসলাম (৫২) ও মো. শাকিল (২০)।

Share this news as a Photo Card